ইন্ডিয়ার নাগপুরে হাজারো ভক্তের উপস্থিতিতে হযরত বাবা তাজউদ্দীনের ১০৪তম বার্ষিক উরস মোবারক সম্পন্ন

ইন্ডিয়ার নাগপুরের ঐতিহাসিক তাজবাগে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সম্প্রীতি ও উৎসবমুখর পরিবেশে সুফি সাধক হযরত বাবা তাজউদ্দীনের ১০৪তম বার্ষিক উরস মোবারক সম্পন্ন হয়েছে। গত ৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ১২ দিনব্যাপী এই আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় উৎসবের মূল আকর্ষণ ‘শাহী সন্দল’ শোভাযাত্রা ও চাদরপোশি গত ১২ই জুলাই (রবিবার) সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এই পুণ্যময় উপলক্ষে প্রিয় মোর্শেদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ফয়েজ হাসিলের উদ্দেশ্যে ভারত এবং বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি আশেকান ও ভক্তবৃন্দের ঢল নামে।

শত বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে গত বুধবার (৯ জুলাই) সকাল ৯টায় ঐতিহ্যবাহী ‘রশমে পরচম কুশাই’ বা দরগাহর পবিত্র সবুজ পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে উরস মোবারকের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়। প্রথা অনুযায়ী কোনো ধর্মীয় আলেম নন, বরং নাগপুরের হিন্দু ভোঁসলে রাজপরিবারের বংশধর শ্রীমন্ত পঞ্চম রাজে রঘুজি ভোঁসলে এই পতাকা উত্তোলন আচারটি সম্পন্ন করেন।
দরগাহর সাজ্জাদানশীন সৈয়দ ইউসুফ ইকবাল তাজি এবং আমীর-ই-শরিয়ত মুফতির সার্বিক দিকনির্দেশনায় আয়োজিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত ধর্মীয় পণ্ডিত মাওলানা সৈয়দ আলে মুস্তফা, তাজউদ্দীন বাবা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান পেয়ারে খান, সেক্রেটারি তাজ আহমদ রাজা, ভাইস-প্রেসিডেন্ট ড. সুরেন্দ্র জিচকার, ট্রাস্টি ফারুকভাই বভেলাম, হাজী ইমরান খান তাজি, গজেন্দ্রপাল সিং হোলিয়া, মুস্তাফাভাই টুপিওয়ালা এবং সৈয়দ মবিন তাজিসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

উরস মোবারক উপলক্ষে তাজবাগ প্রাঙ্গণে প্রতিদিন মিলাদ শরিফ, ধর্মীয় আলোচনা, মাহফিল-ই-জিকির, নাতে মোস্তফা (দ.) ও শানে আউলিয়া (মানকাবাত), সালাতু সালাম এবং বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়। এছাড়া প্রতি সন্ধ্যায় প্রখ্যাত ক্বাওয়ালদের পরিবেশনায় ক্বাওয়ালি সন্ধ্যা ও আধ্যাত্মিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপস্থিত ধর্মপ্রাণ শ্রোতাদের মাঝে এক ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি করে। উরস উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল উরস মেলাও ছিল দর্শনার্থীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

উরসের প্রধান দিবস অর্থাৎ ১২ই জুলাই চন্দন কাঠের পেস্ট ও সুগন্ধিযুক্ত পবিত্র চাদর নিয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘শাহী সন্দল’ শোভাযাত্রাটি বের করা হয়। বর্ণাঢ্য এই শোভাযাত্রাটি নাগপুর শহরের বিভিন্ন প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে দরগাহ শরিফে এসে পৌঁছায় এবং পরম শ্রদ্ধার সাথে তা এই মহান সুফি সাধকের মাজার শরিফে অর্পণ (চাদরপোশি) করা হয়।

বাবা তাজউদ্দীনের উরস মোবারক শত বছর ধরে সর্বজনীন সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে সুপরিচিত। দরগাহ শরিফের ট্রাস্ট ও বংশানুক্রমিক খাদেমদের যৌথ ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই উৎসবে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান এবং পার্সি সম্প্রদায়ের পুণ্যার্থীরা কোনো বৈষম্য ছাড়াই একসাথে শরিক হন। উরসের দিনগুলোতে দরগাহর লঙ্গরখানায় আসা লাখ লাখ দর্শনার্থীকে কোনো প্রকার ভেদাভেদ ছাড়াই তাবারুক খাওয়ানো হয়। বাবা তাজউদ্দীন কখনই কাউকে ধর্ম পরিবর্তনের কথা বলতেন না, বরং উপাসনার ক্ষেত্রে অন্তরের আন্তরিকতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর সেই সম্প্রীতির বার্তা ধারণ করেই নাগপুরে আরও একটি ঐতিহাসিক উরস মোবারক সফলভাবে সমাপ্ত হলো।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত