ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাম্প্রতিক ঘটনা ঘিরে উঠেছে নতুন প্রশ্ন, ধর্মীয় রাজনীতিতে ভোটের হিসাবের চেয়েও পেশিশক্তির প্রাধান্যই বেশী কি-না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতি ও ধর্মভিত্তিক সামাজিক শক্তির গুরুত্ব নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে একটি বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে —রাজনৈতিক দলগুলো কি সংগঠিত ও চাপ তৈরিতে সক্ষম ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর দিকে বেশি ঝুঁকছে, আর তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ও ‘অরাজনৈতিক’ সুফি-সুন্নি ধারার সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে পিছিয়ে পড়ছে?
সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইন্সে উচ্চস্বরে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা এ প্রশ্নকে সামনে এনেছে। ১৮ আগস্ট রাতে ওই ঘটনায় পুলিশ ও মাদ্রাসা-ছাত্রসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা প্রথমে গান-বাজনার শব্দ কমানোর অনুরোধ করেছিলেন। পরে উত্তেজনা ছড়িয়ে সংঘর্ষ হয়।
এ-ঘটনাটি নিয়ে সংসদে আলোচনা করেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি তৌহিদী জনতার এহেন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে সংসদে বক্তব্য রাখার পর আবারো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়৷ মিছিল করে হাসনাত আব্দুল্লাহকে বয়কটের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষায় কটাক্ষ করা হয় তাকে৷ ‘কালাপাঠা’ বলে ডাকতেও শুনা যায় দাঁড়ি, টুপি, পাঞ্জাবী পরিহিত তৌহিদী জনতাকে।
ঘটনার পরদিন জাতীয় নাগরিক পার্টি – এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় গিয়ে ছাত্র ও শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং হাসনাত আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি হাসনাত আব্দুল্লাহ, এমপি নিজের ফেসবুক একাউন্ট থেকে স্ট্যাটাস দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন৷
এখানে রাজনৈতিক আচরণের একটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি স্থানীয় বিরোধ যখন দ্রুত রাজনৈতিক পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা মাদ্রাসায় গিয়ে সমঝোতা করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—কোন্ সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হলে রাজনৈতিক দলগুলো বেশি সতর্ক হয় এবং ‘তৌহিদী জনতা’র সঙ্গে যোগাযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে ‘তৌহিদী জনতা’ কোনো একক সাংগঠনিক পরিচয় নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধর্মীয় আন্দোলন, মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন কিংবা ধর্মীয় দাবিতে রাজপথে সক্রিয় জনগোষ্ঠীকে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে। ফলে পুরো গোষ্ঠীকে একই রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তবে সংগঠিত ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগও নেই। এর একটি উদাহরণ বিএনপির ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ। ২০২৫ সালের আগস্টে যুগান্তর জানিয়েছিল, নির্বাচনের আগে বিএনপি বিভিন্ন ইসলামি দল ও সংগঠন এবং হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল।
২০২৬ সালের এপ্রিলেও কওমি মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নে বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। এ-নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা প্রকাশ্যে বিএনপিকে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাৎ এখানে শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, সংগঠিত ভোট, মাঠের কর্মী, সামাজিক প্রভাব এবং নির্বাচনী দর-কষাকষির সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিপরীতে সুফি-সুন্নি ধারার অবস্থান কোথায় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশের সুফি ও সুন্নি ধারার অনুসারী সংগঠনগুলো সংখ্যায় বা সামাজিক বিস্তারে ছোট—এমন সিদ্ধান্ত দেয়ার মতো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। বরং ঈদে মিলাদুন্নবী, জশনে জুলুস, ওরস, কালচারাল অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনের মাধ্যমে এই ধারার ব্যাপক সামাজিক উপস্থিতি রয়েছে।

২০২৬ সালের ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি আঞ্জুমান ট্রাস্টের অধীনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জমায়েতসহ সারাদেশে বিভিন্ন দরবার ও সংগঠনভিত্তিক ঈদে মিলাদুন্নবীর র্যালী বা বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা দেশের অন্যান্য যে-কোনো জমায়েতের অধিক। অর্থাৎ সুফি-সুন্নি ধারার ধর্মীয় উপস্থিতি নেই—এ-কথা বলার সুযোগ নেই। প্রশ্নটি বরং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা নিয়ে। সুফি-সুন্নি ধারার বড় একটি অংশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঐতিহ্যগতভাবে পীর-মাশায়েখ, খানকা, মাদ্রাসা, মসজিদ, ওরস ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সামাজিক পরিসরে সীমাবদ্ধ।
বিপরীতে কওমি-মাদ্রাসাভিত্তিক কিছু সংগঠন নির্দিষ্ট দাবিতে দ্রুত সমাবেশ, বিক্ষোভ, কর্মসূচি ও চাপ তৈরির সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দ্বিতীয় পক্ষের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক মূল্য বেশি দৃশ্যমান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
একদিকে মাদ্রাসা ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর রাজনৈতিক দলের নেতা মাদ্রাসায় গিয়ে সরাসরি বৈঠক করেছেন। অন্যদিকে একই ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সামাজিক বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, সেখানে বহু বছর ধরে গান-বাজনা ও সিনেমা অনেকটা নিষিদ্ধের মতো এবং এলাকার পরিস্থিতি আলাদা।
এর ফলে ঘটনাটি শুধু একটি স্থানীয় সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি, ধর্মীয় অনুভূতি এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, সুফিপন্থীরা সত্যিই ‘উপেক্ষিত’ কি-না?
এখানে সতর্ক হওয়া দরকার। ‘সুফিপন্থীরা উপেক্ষিত’—এটি একটি মত, প্রতিষ্ঠিত বা পরিক্ষীত নয়। কারণ সুফি-সুন্নি সংগঠনগুলো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে এবং তাদের অনেক বড় ধর্মীয় আয়োজনও রয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে একটি বৈষম্যের প্রশ্ন তোলা যায়।