সিলেটের আধ্যাত্মিক আকাশে তখন আসরের আজান আসন্ন। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ৭০৭তম ওরস শরীফের শেষ দিন। মাজারের অনেক আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে এমন একটি রীতি পালিত হয়, যা সাধারণ দর্শনার্থীদের অনেকের কাছেই অজানা। এটি হলো মাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘শরবত’ তৈরির প্রক্রিয়া। ভক্তি, শৃঙ্খলা আর প্রাচীন নিয়মের মেলবন্ধনে এই আয়োজন এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে।

প্রস্তুতির শুরু ও মুতাওয়াল্লি সাহেবের তদারকি:
আসরের নামাজের আগেই মাজার প্রাঙ্গণে শুরু হয় বিশাল কর্মযজ্ঞ। বড় বড় ডেগচিগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর সেগুলোর মুখ ঢেকে দেওয়া হয় লম্বা সাদা কাপড় দিয়ে এবং শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয়। পাশেই সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকে মাটির কলস। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি তদারকি করেন মাজারের মুতাওয়াল্লি সাহেব। তাঁর উপস্থিতি ও নির্দেশনায় প্রতিটি কাজ চলে অত্যন্ত ধীরস্থির ও সুশৃঙ্খলভাবে।
খালি কলস থেকে পূর্ণতা:
নির্দিষ্ট একটি ঘরের দরজা খোলার সাথে সাথেই সেখানে ভিড় জমান একদল লোক। মুতাওয়াল্লি সাহেব নিজ হাতে একে একে সবার হাতে তুলে দেন মাটির কলস। খালি কলস হাতে পাওয়া মানুষের মুখে যে তৃপ্তির হাসি দেখা যায়, তাতেই বোঝা যায় এর মাহাত্ম্য। এরপর সেই কলসধারীরা মাজারের ভেতরে থাকা কুয়া থেকে পানি তোলেন। পানি ভর্তি কলস মাথায় নিয়ে তারা মাজারের পেছনের গেট ও সিঁড়ি পেরিয়ে পুনরায় সেই ঘরে ফিরে যান এবং মুতাওয়াল্লি সাহেবের কাছে পানি হস্তান্তর করেন।

শরবত তৈরির বিশেষ কৌশল:
ডেগচির পানিকে শরবতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিও বেশ চমকপ্রদ। ডেগচির মুখ যেহেতু সাদা কাপড়ে শক্ত করে বাঁধা থাকে, তাই চিনি সরাসরি ভেতরে দেওয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে চিনি ঢালা হয় ডেগচির মুখের ওপর থাকা সাদা কাপড়ের ওপর। এরপর দ্রুতগতিতে পাইপের মাধ্যমে পানি স্প্রে করা হয়। পানির চাপে চিনি গলে গলে কাপড়ের ছিদ্র দিয়ে নিচে পড়ে এবং পানির সাথে মিশে যায়। এর সাথে যোগ করা হয় আরও কিছু সুগন্ধি ও পবিত্র উপাদান। এভাবেই তৈরি হয় ভক্তদের কাঙ্ক্ষিত সেই তবারক বা শরবত।

বিতরণ ও ভক্তদের আকুতি:
আসরের নামাজের পর শুরু হয় এই শরবত বিতরণ। বোতল হাতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন হাজার হাজার মানুষ। প্রিয় ওলির দরগাহর এই শরবতের প্রতি ভক্তদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস এতটাই গভীর যে, বিতরণকারীর কাছে তাদের বিনীত অনুরোধ শোনা যায়— “হুজুর, আরেকটু বেশি দেওন যাইবো নি?”

আধ্যাত্মিক এই নগরীতে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ছোট ছোট রীতিগুলোই শাহজালালের ওরসকে সাধারণ সমাবেশের চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও অর্থবহ করে তুলেছে।
লেখা ও ছবির জন্য শেখ ফাহিম ফয়সালের নিকট দায়বদ্ধ।