পবিত্র আশুরা বা ১০ই মহররম ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশে সরকারিভাবে সাধারণ ছুটি পালন করা হয়। কারবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সঙ্গীদের মহান আত্মত্যাগ মুসলিম বিশ্বে সত্য, ন্যায় এবং জুলুমের বিরুদ্ধে অবিচল অবস্থানের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে পবিত্র আশুরা ও শোহাদায়ে কারবালা উপলক্ষে বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির দাবিদার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ এবং শীর্ষ নেতাদের ডিজিটাল কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এক ভিন্নধর্মী চিত্র দেখা গেছে।
জামায়াতে ইসলামীর দলীয় পেজে নীরবতা, পোস্ট করেছেন আমীর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে পবিত্র আশুরা বা শুহাদায়ে কারবালা উপলক্ষে কোনো বিশেষ পোস্ট, ফটোকার্ড বা আনুষ্ঠানিক বার্তা দেখা যায়নি। তবে দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান তাঁর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে আশুরা উপলক্ষে একটি পোস্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন— আশুরা শুধু হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের কারণেই নয়, মানবজাতির ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষণীয় একটি দিন। তিনি আরও বলেন, আশুরার মূল শিক্ষা হলো অন্যায়, জুলুম ও অসত্যের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা। অন্যদিকে, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে আশুরা উপলক্ষে কোনো পোস্ট দেখা যায়নি।
‘কারবালার চেতনা’র দাবিদার ইসলামী ফ্রন্টের দলীয় পেজেও নেই কোনো বার্তা
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সভা-সমাবেশের প্রচারণায় নিজেদের ‘কারবালার চেতনায় উজ্জীবিত’ বলে দাবি করে আসছে। তবে বিস্ময়করভাবে, আশুরা উপলক্ষে দলটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে শোহাদায়ে কারবালা নিয়ে কোনো পোস্ট, দলীয় বিবৃতি কিংবা স্মরণবার্তা পাওয়া যায়নি। অবশ্য দলটির মহাসচিব অধ্যক্ষ স.উ.ম. আব্দুস সামাদ তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মহান ত্যাগের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তই আজকের আশুরার মূল প্রতিপাদ্য।’
অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও অনীহা
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: দলটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ পর্যালোচনায় আশুরা বা শোহাদায়ে কারবালা উপলক্ষে কোনো ধরনের পোস্ট, ফটোকার্ড বা আনুষ্ঠানিক বার্তা দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস: এই দলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজেও আশুরা উপলক্ষে কোনো পোস্ট পাওয়া যায়নি। এমনকি দলটির অন্যতম শীর্ষ নেতা ও আমীর মাওলানা মামুনুল হকের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজেও শোহাদায়ে কারবালা বা আশুরার তাৎপর্য বিষয়ে কোনো পোস্ট বা বার্তা পরিলক্ষিত হয়নি।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ: দলটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজেও আশুরা বা শুহাদায়ে কারবালা উপলক্ষে কোনো পোস্ট কিংবা বার্তা প্রকাশ করা হয়নি।
খেলাফত মজলিস: খেলাফত মজলিসের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে মহররম মাসে রোজা রাখার ফজিলত বিষয়ে একটি সাধারণ ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সেখানে শোহাদায়ে কারবালা, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত কিংবা কারবালার ঘটনার ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে কোনো পৃথক বক্তব্য ছিল না।
ডিজিটাল কার্যক্রমে অসঙ্গতি ও প্রশ্ন
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক দলগুলোর জনযোগাযোগ ও আদর্শিক অবস্থান প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ধর্মীয়, জাতীয় কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দিবসে দলীয় অবস্থান ও সুনির্দিষ্ট বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে ফেসবুকসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
এমন বাস্তবতায়, দেশের ইসলামী রাজনীতির দাবিদার অধিকাংশ মূলধারার দলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে শোহাদায়ে কারবালার মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ দিনে কোনো পৃথক বার্তা বা স্মরণপোস্ট না থাকা নিয়ে খোদ সুফি ধারার মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও কয়েকজন শীর্ষ নেতা ব্যক্তিগতভাবে আশুরার তাৎপর্য তুলে ধরেছেন, তবে দিবসটি ঘিরে দলীয় অবস্থান এবং ব্যক্তিগত ডিজিটাল উপস্থিতির মধ্যে একটি স্পষ্ট অসঙ্গতি ও দূরত্ব লক্ষ্য করা গেছে। ইসলামী রাজনীতির দাবিদার দলগুলো ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে নিজেদের রাজনীতির সঙ্গে সাধারণ মুসলমানদেরকে কতটুকু যুক্ত করতে ইচ্ছুক বা সচেতন তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।