মানব মর্যাদা রক্ষায় নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আহ্বান: আল-আযহার ও জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগ

 

বর্তমান বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও এর সম্ভাব্য ঝুঁকি যখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই এআই প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে এবং মানবিক মূল্যবোধ ও মর্যাদা রক্ষায় ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বের শীর্ষ ইসলামি বিদ্যাপীঠ আল-আযহার আল-শরিফ এবং জাতিসংঘ (UN)।

গত ২৮ জুন (রোববার) মিশরের কায়রোস্থ আল-আযহারের সদর দপ্তরে বিশ্ব মুসলিমের অন্যতম শীর্ষ ধর্মীয় নেতা, আল-আযহারের গ্র্যান্ড ইমাম অধ্যাপক ড. আহমদ আত-তাইয়্যিব এবং জাতিসংঘের উপ-মহাসচিব আমিনা মোহাম্মদের মধ্যে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

আনুষ্ঠানিক বৈঠকে আল-আযহারের গ্র্যান্ড ইমাম অধ্যাপক ড. আহমদ আত-তাইয়্যিব এবং জাতিসংঘের উপ-মহাসচিব আমিনা মোহাম্মদ। (ছবি: সংগৃহীত)

বৈঠকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী মন্তব্য করে গ্র্যান্ড ইমাম ড. আহমদ আত-তাইয়্যিব বলেন, “সুনির্দিষ্ট নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের সুদৃঢ় নির্দেশনা ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই লাগামহীন ও দ্রুত বিস্তার মানবজাতির ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।” তিনি গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রযুক্তির ওপর মানুষের অতিরিক্ত ও অন্ধ নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত মানবমস্তিষ্কের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি, গভীর প্রজ্ঞা ও সহজাত সৃজনশীলতাকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেবে। এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো—ভবিষ্যতে এই শক্তিশালী প্রযুক্তি মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিপতি বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে গোটা বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার এক বিপজ্জনক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গ্র্যান্ড ইমাম আল-আযহারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যেকোনো বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অবশ্যই মানবসভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা কখনো নৈতিকতা ও মানবিকতার বিনিময়ে হতে পারে না। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামগ্রিক উন্নয়ন, প্রোগ্রামিং এবং এর প্রায়োগিক ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে একটি শক্তিশালী সর্বজনীন নৈতিক কাঠামো (Ethical Framework) তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।”

জাতিসংঘের উপ-মহাসচিব আমিনা মোহাম্মদ গ্র্যান্ড ইমামের এই কালজয়ী দর্শনকে সাধুবাদ জানান এবং বিশ্বজুড়ে ‘নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ (Ethical AI) গঠনে আল-আযহারকে জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি এক অভূতপূর্ব ঘোষণা দিয়ে জানান যে, মানব মর্যাদা এবং নৈতিক মূল্যবোধকে মূল কেন্দ্রে রেখে জাতিসংঘের যে নতুন বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্যোগ, তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা ও প্রচার মূলত এই ঐতিহ্যবাহী আল-আযহার থেকেই শুরু হলো।

জাতিসংঘের উপ-মহাসচিব আরও বলেন, “প্রযুক্তি সর্বদা মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবে; কোনোভাবেই মানুষের ওপর মানসিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে একে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না। একমাত্র দায়িত্বশীল ও সুনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই বিশ্বে ন্যায়বিচার, টেকসই শান্তি এবং প্রকৃত মানবকল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।”
ঐতিহাসিক এই বৈঠকে আল-আযহার ও জাতিসংঘ—উভয় পক্ষই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ধ্বংসাত্মক বা মানুষের মর্যাদাহানিকর কাজে ব্যবহার রোধে এবং একে মানবতার প্রকৃত কল্যাণে নিয়োজিত করতে সুফি-দর্শনসুলভ বিশ্বজনীন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত