বিপন্ন মানবতার পাশে ‘গরিবের হাসি ফাউন্ডেশন’: বন্যাকবলিত এলাকায় নগদ অর্থ, খাবার ও চিকিৎসা সহায়তার অনন্য নজির

চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলের অবরুদ্ধ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী মানবিক সংগঠন ‘গরিবের হাসি ফাউন্ডেশন’। তীব্র ঝড়-বৃষ্টি ও যাতায়াতের চরম প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে সংগঠনটির একাধিক টিম দিন-রাত মাঠপর্যায়ে বন্যাদুর্গত ও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা শত শত অসহায় পরিবারের মাঝে রান্না করা খাবার, শুকনো খাবার, জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিচ্ছে।

চট্টগ্রামে দিনভর কেনাকাটার ব্যস্ততা
ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রমের প্রস্তুতিপর্বে ফাউন্ডেশনের দায়িত্বশীলেরা চট্টগ্রাম শহরে দিনভর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। দুর্গম জায়গাগুলোর বাস্তব ও তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয়তা যাচাই করেই তারা মালামাল সংগ্রহ করছেন। সরল ইউনিয়নের দুর্গমতার কারণে সেখানে রান্নার পরিবেশ না থাকায় শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বাহারছড়া ইউনিয়নের জন্য রান্না করা খাবারের কাঁচামাল কেনা হয়েছে।

ত্রাণ সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষে ট্রাকে তোলা হচ্ছে। (ছবি: সংগৃহীত)

‘টিম-ওয়ান’ ও ‘টিম-টু’ ফরম্যাশন
পিকআপ ভ্যান বা বড় যানবাহন যেখানে গিয়ে থমকে যায়, সেখান থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠা চালিত নৌকায় চড়ে দুর্গম পথ পেরিয়ে অসহায় মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে যাচ্ছে গরিবের হাসি ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা। দুর্গম এলাকায় দ্রুত ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে দুটি টিম তৈরি করে কার্যক্রম পরিচালনা করে ফাউন্ডেশনটি।

নৌকায় করে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকরা। (ছবি: সংগৃহীত)

বাঁশখালীর ৭ নং সরল ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের এমন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফাউন্ডেশনের ‘টিম-ওয়ান’ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন যে বন্যার শুরু থেকে আজ অব্দি কোনো ধরণের সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছেনি। অত্যন্ত দুর্গম ও অবরুদ্ধ এই এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থা এতটাই কঠিন যে, পিকআপ সর্বশেষ যেখানে থামে সেখান থেকে বৈঠা চালিত নৌকায় পৌঁছাতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। গতকাল প্রথমবার সেখানে ছোট নৌকায় করে মাত্র ৩০ প্যাকেট শুকনো খাবার নিয়ে দুইজন পদাতিক স্বেচ্ছাসেবী পৌঁছাতে পেরেছিলেন।

পানিবন্দী পরিবারগুলোর নিকট ত্রাণ পৌঁছাতে ঘরে ঘরে গিয়ে সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকরা। (ছবি: সংগৃহীত)

একইদিনে ফাউন্ডেশনের ‘টিম-টু’ বাঁশখালীর মিনঝিরতলা-বয়নাকাটা এবং কাতারিয়ায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

বাহারছড়া ও পূর্ব ছাপাতলীতে ৭০০ পরিবারের রাতের খাবার
গত ৯ ও‌ ১০ জুলাই ত্রাণ কার্যক্রমের প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে, তীব্র দুর্যোগের মাঝেও পুরো রাত জেগে বাহারছড়া ইউনিয়নের বন্যার্ত গ্রামগুলোর প্রায় ৭০০টি অবরুদ্ধ পরিবারের জন্য রাতের খাবার তৈরি করে তা ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। যেসব ঘরবাড়ি এখনো পানির নিচে নিমজ্জিত রয়েছে, সেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেরা বুক সমান পানি মাড়িয়ে অথবা স্থানীয় বিশ্বস্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। এছাড়া রাত ১২টায় পূর্ব ছাপাতলী ৯ নং ওয়ার্ডের ১৭০টি জলমগ্ন পরিবারের জন্য স্থানীয় প্রতিনিধিদের হাতে ভালোবাসার উপহার সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।

আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের তীব্র অসুস্থতা ও ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প
ফাউন্ডেশনের সদস্যরা মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গাদাগাদি করে থাকা ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সরল ইউনিয়নের বৈলতলী আশ্রয়কেন্দ্রের প্রায় প্রতিটি শিশুই তীব্র অসুস্থতায় ভুগছিল। বন্যার নোংরা পানির কারণে অধিকাংশ মানুষের পায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষত, খোসপাঁচড়া ও অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিয়েছে। এছাড়াও জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং উচ্চ রক্তচাপসহ (প্রেশার) নানা জটিলতায় ভুগছিলেন অধিকাংশ মানুষ। চিকিৎসা নেয়া স্থানীয় নাগরিক বয়োবৃদ্ধ করিম মিয়া দ্য সুফি টাইমসকে বলেন, ’অনেকে খালি খানাদানা দেয়, ওষুদ দেয় না। তারা খানাদানার লগে ওষুদও দিতাছে। এইডা খুব ভালা কাম।’

বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরী চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে “ফ্রী মেডিকেল ক্যাম্প”র ব্যবস্থা করা হয়। (ছবি: সংগৃহীত)

প্রয়োজন বুঝে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণকে প্রধান কাজ মনে করে গরিবের হাসি ফাউন্ডেশন তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে একটি ‘ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প’-এর আয়োজন করে। জীবনরক্ষাকারী মেডিসিনের প্রায় সকল ওষুধ সেখানে বিনামূল্যে রোগীদের মাঝে বিতরণ করা হয়। ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্যালাইনের পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষায় ডায়াপার এবং নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতায় স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করা হয়। ফাউন্ডেশন অনুভব করেছে যে, বৈলতলী আশ্রয়কেন্দ্রের মতো প্রায় প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রেই এখন জরুরি মেডিকেল ক্যাম্পের প্রয়োজন। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের অন্যান্য সকল দল ও বিত্তবানদের খাবারের পাশাপাশি চিকিৎসার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সময়ের প্রয়োজনে চাহিদার পরিবর্তন
ফাউন্ডেশনের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা জানিয়েছেন, বন্যা পরিস্থিতি দিন দিন কিছুটা উন্নত হচ্ছে এবং বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে দুর্গত মানুষের চাহিদার ধরণও বদলেছে। এই মুহূর্তে উপদ্রুত অধিকাংশ এলাকায় শুকনো খাবারের চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নগদ আর্থিক সহায়তা।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে সর্বস্তরের দানশীল মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, “আপনারা যারা এখন সহযোগিতা করতে চান, তারা সম্ভব হলে শুকনো খাবারের পরিবর্তে নগদ অর্থ দিয়ে বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ান। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিজেদের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য কিনতে পারবে, ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ি মেরামত করতে পারবে এবং নতুন করে জীবন শুরু করার সাহস পাবে।” বন্যায় অনেক পরিবারের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, যাদের পুনর্বাসনের জন্য এখন সম্মিলিত দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

বিপন্ন মানুষের মুখে একটু স্বস্তির হাসি ফোটাতে পারাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করছেন দায়িত্বশীলরা। গরিবের হাসি ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল শেখ আহমেদ রাকিব দ্য সুফি টাইমসকে বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জরুরী চাহিদা পূরণ করতে প্রায় সকল প্রকার সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই আমাদের এই ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত