রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসায় একাদশে ভর্তি: ১৯৬৮ থেকে চলা এই প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ খ্যাতি রয়েছে আদব-আখলাক ও ফলাফল ও ঐতিহ্যে।

রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসায় ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম চলছে। প্রতিষ্ঠানটির পুরুষ ও মহিলা—উভয় শাখায় শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ রয়েছে। রয়েছে সাধারণ ও বিজ্ঞান বিভাগ।

প্রায় ছয় দশকের শিক্ষা-ঐতিহ্য ধারণ করে আসা এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালে। এর প্রতিষ্ঠাতা উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক হাফেজ কারী সৈয়্যদ মোহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রহ.)। মাদ্রাসার নিজস্ব ওয়েবসাইটেও সৈয়্যদ আহমদ শাহ সিরিকোটি (রহ.), সৈয়্যদ তৈয়্যব শাহ (রহ.), সৈয়্যদ মোহাম্মদ তাহের শাহ ও সৈয়্যদ মোহাম্মদ সাবির শাহকে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠা পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে যুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুরুটা হয়েছিল ফোরকানিয়া মক্তব দিয়ে
প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসবিষয়ক একটি বিস্তারিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালের প্রথম দিকে বর্তমান স্থানে মাদ্রাসার কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে বছরই প্রায় ১০টি কক্ষ নিয়ে প্রাথমিক ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় এবং ফোরকানিয়া মক্তবের মাধ্যমে পাঠদান শুরু হয়। শুরুর দিকে কয়েকজন আলেম শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছোট পরিসরের সেই উদ্যোগটি পূর্ণাঙ্গ আলিয়া মাদ্রাসায় রূপ নেয়।

বর্তমানে এখানে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধীনে অনার্স-মাস্টার্স করার সুযোগ।

ছবিতে মাদ্রাসার বার্ষিক পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা।

আদব-আখলাকের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব

কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে সংশ্লিষ্টদের কাছে আদব-আখলাক ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা বিশেষভাবে পরিচিত। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, শিষ্টাচার, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলি অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটি আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী জ্ঞান ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। এছাড়াও উক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুলনামূলক আদবের শিক্ষাটা অধিক বলে সমাদৃত।

ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা
শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে সাফল্যের ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের তথ্যভান্ডারে কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসা EIIN ১০৮২৪৪ হিসেবে তালিকাভুক্ত।

সাম্প্রতিক দাখিল পরীক্ষা-২০২৬-এর ফলাফলেও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা ভালো সাফল্য অর্জন করেছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ওই বছর মাদ্রাসা থেকে ২৯ জন শিক্ষার্থী A+ পেয়েছে এবং মোট শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯৭ শতাংশ কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে।

এ-ছাড়া ২০২৩ সালের সরকারি ফলাফল পরিসংখ্যানেও প্রতিষ্ঠানটির দাখিল পর্যায়ে সাধারণ ও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের সন্তোষজনক ফলাফলের তথ্য পাওয়া যায়।

উচ্চশিক্ষার পথও উন্মুক্ত
কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি ফাজিল ও কামিল পর্যায়েও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভর্তি তালিকাতেও কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ফাজিল অনার্সে ভর্তির তথ্য পাওয়া যায়। ফলে দাখিল ও আলিম পর্যায়ের পর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের সামনে একই ধারার শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ রয়েছে।

দাখিল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও শ্রেণী শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীরা।

রাজধানীতে নিজস্ব ঐতিহ্য
মোহাম্মদপুরের জয়েন্ট কোয়ার্টার এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার একটি পরিচিত নাম। বিভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক নথিতেও প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান, EIIN ও শিক্ষা কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্যেও কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসাকে মোহাম্মদপুরের একটি দিনের শিফটের বাংলা ভার্সনের সাধারণ বিভাগ, ও বিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।

শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রমের কেন্দ্র
কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসা শুধু নিয়মিত পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়; বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক আয়োজনেও প্রতিষ্ঠানটির মাঠ ও প্রাঙ্গণ ব্যবহৃত হয়। জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটির মাঠে বড় পরিসরে মাহফিলের আয়োজনও হয়েছে, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

এভাবে প্রায় ছয় দশকের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি একদিকে যেমন আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার ধারাকে এগিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও নিজেদের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে।

নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি সুযোগ
চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির মাধ্যমে নতুন শিক্ষার্থীদের জন্যও সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের শিক্ষা পরিবেশে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পুরুষ ও মহিলা উভয় শাখায় ভর্তির সুযোগ থাকায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানটিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারছেন।

প্রায় ছয় দশকের ঐতিহ্য, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব, আদব-আখলাকের চর্চা এবং ধারাবাহিক ভালো ফলাফলের কারণে কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসা রাজধানীতে মাদ্রাসা শিক্ষায় একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে।

প্রতিষ্ঠার বছর: ১৯৬৮
প্রতিষ্ঠাতা: হাফেজ কারী সৈয়্যদ মোহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রহ.)
EIIN: ১০৮২৪৪
মাদ্রাসা কোড: ১১০৫৪

ঠিকানা: ৯/২এ, মাদ্রাসা রোড, জয়েন্ট কোয়ার্টার, ব্লক-এফ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭
ব্যবস্থাপনা: আঞ্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট, ঢাকা

ভর্তি-সংক্রান্ত যোগাযোগ: ০১৩০৯১০৮২৪৪
ই-মেইল: quaderiamadrasah@gmail.com

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত