বরগুনার আমতলী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ইসমাইল শাহের মাজারে আবারও গভীর রাতে কেরোসিন ছিটিয়ে অগ্নিসংযোগের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে সংঘটিত এই পরিকল্পিত হামলায় মাজারের পবিত্র গিলাফের একাংশ পুড়ে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে একই মাজারে নতুন করে এই বর্বরোচিত অগ্নিসংযোগের ঘটনায় স্থানীয় সুফি ভক্তবৃন্দ ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের অভিযোগ, সুফি ভাবধারা ও মাজার সংস্কৃতিকে চিরতরে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে একটি উগ্রপন্থী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে বারবার এই অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালাচ্ছে। তিনি ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অবরুদ্ধ করে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ
শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) দুপুরে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাজারের পবিত্র গিলাফের একাংশ আগুনে পুড়ে কালো হয়ে গেছে। মাজারের মেঝে এবং ইসমাইল শাহের ছেলে শহীদ চিশতির বসতঘরের চারপাশে ছিটানো কেরোসিনের স্পষ্ট দাগ ও গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
লোমহর্ষক এই ঘটনার বিবরণ দিয়ে ইসমাইল শাহের ছেলে শহীদ চিশতি বলেন, “গভীর রাতে মানুষের চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে তীব্র কেরোসিনের গন্ধ পাই। জীবন বাঁচাতে বাইরে বের হতে গিয়ে দেখি দুর্বৃত্তরা আমার ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকে দিয়েছে, যাতে আমরা বের হতে না পারি। পরে প্রতিবেশীরা এসে বাইরের ছিটকিনি খুলে দিলে আমরা অলৌকিকভাবে বেঁচে যাই।”
মাজারের প্রবীণ ভক্ত ও প্রত্যক্ষদর্শী সেকান্দার বয়াতি বলেন, “রাতে প্রকৃতির ডাকে বাইরে বের হয়ে হঠাৎ দেখি মাজারে আগুন জ্বলছে। আমার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনায় মাজারটি বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়।”
এক বছর আগের সেই ভয়াবহ হামলা
স্থানীয় ও মাজারের নথিসূত্রে জানা গেছে, আমতলী পৌর শহরের বটতলা এলাকায় ১৯৯৬ সালে ইসমাইল শাহের মাজারটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তখন থেকেই প্রতিবছর দুই দিনব্যাপী ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর আগে গত বছরের (২০২৫ সালের) ১৬ মার্চ রাতে মাজারটির ওপর এক ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
২৮তম বার্ষিক ওরস চলাকালে পবিত্র রমজান মাসের অজুহাত তুলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমতলী উপজেলা শাখার সভাপতি ওমর ফারুক জেহাদী ও সাধারণ সম্পাদক গাজী বায়েজিদের নেতৃত্বে শতাধিক লাঠিসোঁটাধারী ব্যক্তি অতর্কিতভাবে ওরস প্রাঙ্গণে হামলা চালায়। সে সময় দুর্বৃত্তরা মাজারের ভেতরের শামিয়ানা ও দুটি বৈঠকখানা পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, ভক্তদের মারধর করে এবং মাজারের দানবাক্স লুটপাট করে। আগুন নেভাতে ও হামলার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে সে সময় অন্তত ২০ জন সুফি ভক্ত গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
সেই ঘটনার এক বছর চার মাস পার হতে না হতেই আবারও একই কায়দায় মাজার ও খাদেমের পরিবারকে পুড়িয়ে মারার উদ্দেশ্যে এই চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হলো।
আইনগত পদক্ষেপের আশ্বাস
মাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত বছর ওরস চলাকালে উগ্রবাদীরা প্রকাশ্যে হামলা চালিয়েছিল। এবার রাতের আঁধারে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। আমরা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
এ বিষয়ে আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াকুব হোসাইন জানান, “খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। মাজার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”