হযরত শাহ মখদুম সাফির সঙ্গে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের ঐতিহাসিক ঘটনা: গুজরাট বিজয়ে শাহ মখদুমের প্রভাব

 

ইন্ডিয়ার উত্তরপ্রদেশের সাফিপুরে শায়িত হযরত শাহ মখদুম সাফির সঙ্গে সম্রাট হুমায়ুনের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে। এই ঘটনাটি ইন্ডিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মুঘল সম্রাট হুমায়ুন যখন লক্ষ্ণৌতে এলেন, তখন চারদিকে হযরত মখদুম শাহ সাফির আধ্যাত্মিক সুখ্যাতি ও কারামতের কথা শুনে তিনি নিজে সশরীরে এসে জিয়ারত করার এবং সাক্ষাৎ লাভের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু শাহ মখদুম যখন জানতে পারলেন যে, দিল্লির সম্রাট হুমায়ুন তাঁর সাথে দেখা করতে আসছেন, তখন আল্লাহর প্রেমে মত্ত এই সুফি অবলীলায় এক ঐতিহাসিক বাক্য উচ্চারণ করলেন, ‘গাধা মারল লাথি, হুমায়ুন গিয়ে পড়ল গুজরাট।’

বাস্তবে দেখা গেল, হুমায়ুন যখন লক্ষ্ণৌ থেকে সাফিপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, তখন সাফিপুরের সীমানার কাছাকাছি আসতেই অলৌকিকভাবে তিনি এক গভীর ও অচেতন ঘুমে তলিয়ে গেলেন। তাঁর রাজকীয় সওয়ারি বা বাহন চালকেরা সাফিপুরের মূল রাস্তা এড়িয়ে বাইরের বিকল্প পথ দিয়ে ফতেহপুর চৌরাসী নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছল। যখন সম্রাটের ঘুম ভাঙল এবং তিনি চারপাশ দেখে উজিরদের জিজ্ঞেস করলেন, তখন তাঁকে জানানো হলো, ‘জাহাঁপনা, সাফিপুর শরিফ তো অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছি। এটা ফতেহপুর চৌরাসী।’ ঠিক সেই মুহূর্তেই সম্রাটের কাছে জরুরি রাজকীয় গুপ্তচর মারফত খবর এলো যে, গুজরাটে এক বিশাল ও ভয়াবহ বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে এবং সম্রাটের অবিলম্বে সেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। তখন গুজরাটে দ্রুত রওনা দেয়ার সময় হুমায়ুন আক্ষেপ করে ও কেঁদে বললেন, ‘হয়তো হযরত মখদুম সাফি আমার হাজিরা ও সাক্ষাৎ পছন্দ করেননি।’ তাই তিনি গভীর শ্রদ্ধা ও আদবের নিদর্শনস্বরূপ তাঁর প্রধান উজিরের মাধ্যমে ২ জন দাসী এবং বিশেষ রাজকীয় নজরানা হযরতের দরবারে পাঠিয়ে দিলেন।

সম্রাটের প্রধান উজির যখন সেই দাসীদের এবং বিপুল নজরানা নিয়ে হযরতের খেদমতে পৌঁছলেন, তখন হযরত আপন মনে অজু করছিলেন। সেই রাজকীয় দাসীরা যখন তাঁর নূরানী অবয়ব দর্শন করল এবং তিনি তাদের দিকে দয়ার নজরে তাকালেন, তখন তাদের কলবে খোদাভীতির এক গভীর প্রভাব পড়ল। তারা তৎক্ষণাৎ রাজকীয় সমস্ত মূল্যবান রেশমি পোশাক ও স্বর্ণালঙ্কার শরীর থেকে খুলে ফেলে দরবারের ফকির-মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দিল। এরপর একদম সাদাসিধে ও সুফিদের পোশাক পরিধান করে একজন দাসী খানকার পানি টানার কাজে এবং অন্যজন খানকার আঙিনা ঝাড়ু দেয়ার কাজে নিয়োজিত হলো। সারাজীবন এই দুই রাজকীয় দাসী খানকাহ শরিফের নিঃস্বার্থ খেদমত করে গেছেন এবং ইন্তেকালের পর তাঁদের সম্মানার্থে খানকাহ প্রাঙ্গণেই সমাহিত করা হয়।

এদিকে উজির যখন রাজকীয় দায়িত্ব পালন শেষে বিদায় নিতে লাগলেন, তখন তিনি সকল রাজকীয় নজরানা ও অর্থকড়ি ফিরিয়ে দিলেন এবং তাঁর বসার পুরানো চাটাইয়ের কয়েকটি খড়কুটো বা কাঠি উজিরের হাতে দিয়ে বললেন, ‘যাও, এটা হুমায়ুনকে দিয়ে দিও।’ সম্রাট হুমায়ুন যখন গুজরাটের রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে হযরতের প্রদান করা সেই তাবাররুক (চাটাইয়ের কাঠি) হাতে পেলেন, তখন তিনি আনন্দের সাথে চুমু খেয়ে বললেন, ‘এই তাবারুকের রূহানি বরকতে ইনশাআল্লাহ গুজরাটে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত।’ বাস্তবেও ঠিক তাই ঘটেছিল, হুমায়ুন অতি সহজেই গুজরাট জয় করেছিলেন।

ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, মুঘল সম্রাট হুমায়ুন ১৫৩৫ সালে গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহকে পরাজিত করে গুজরাট ও মালব জয় করেন। এই জয়ের পেছনে আছে হযরত শাহ মখদুম সাফির নেকনজর ও দোয়া।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত