তাজদারে সাফিপুর হযরত মখদুম শাহ সাফি আব্দুস সামাদ (রহ.)-এর জীবনী, কারামত ও খলিফাবৃন্দ

 

ভূমিকা ও উপাধি
সুফি সাধনার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত মখদুম শাহ সাফি আব্দুস সামাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। আধ্যাত্মিক জগতে তাঁর সুউচ্চ মর্যাদার কারণে তাঁকে ‘তাজদারে সাফিপুর’ অর্থাৎ সাফিপুরের মুকুটহীন সম্রাট উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

বংশপরিচয় ও পারিবারিক ঐতিহ্য
তাঁর পিতার নাম হযরত মাওলানা ইলম-উদ-দ্বীন বিন মাওলানা জাইন-উল-ইসলাম। বংশানুক্রমিক ধারায় তিনি ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান গণী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর পবিত্র বংশধর। তাঁর পিতা ছিলেন সুহরাওয়ার্দী তরীকার একজন উচ্চমাপের বুজুর্গ। তাঁর পরদাদা হযরত শাহ আকরাম সুহরাওয়ার্দী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এক হিন্দু রাজার শাসন আমলে ‘সাইপুর’ নামক কসবায় (উপশহরে) আগমন করেছিলেন। তাঁর পবিত্র শুভাগমনের বরকতে সে সময় ওই হিন্দু প্রধান অঞ্চলে ইসলামের ঐশ্বরিক নূর ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে মুসলমানদের বসতি গড়ে ওঠে।

ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী ও স্থানের নামকরণ
সাইপুর অঞ্চলে আগমনের পর তাঁর পরদাদা হযরত শাহ আকরাম সুহরাওয়ার্দী (রহ.) একটি ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের বংশে এমন এক পুত্রসন্তান জন্ম নেবে, যার পবিত্র নামের বরকতে আগামী দিনে এই পুরো জায়গাটি জগৎজুড়ে প্রসিদ্ধি লাভ করবে।’ পরবর্তী সময়ে তাঁর সেই বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয় এবং মখদুম শাহ সাফির নামানুসারে সেই অঞ্চলের নাম ‘সাইপুর’ থেকে রূপান্তরিত হয়ে ‘সাফিপুর’ নামে বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত হয়।

প্রাথমিক ও উচ্চতর শিক্ষা লাভ
তিনি শৈশবে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন সুপণ্ডিত পিতার কাছ থেকে। পারিবারিক পরিমণ্ডলে বুনিয়াদি শিক্ষা সমাপ্তির পর উচ্চতর জ্ঞান অন্বেষণের উদ্দেশ্যে খায়রাবাদ গমন করেন। সেখানকার প্রসিদ্ধ মাদরাসায় ‘শাহে বেলায়েত’ হযরত মখদুম শেখ সাদ-উদ-দ্বীন খায়রাবাদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পবিত্র সান্নিধ্যে থেকে দীক্ষা নিয়ে এবং কঠোর সাধনার মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন সম্পন্ন করেন।

উস্তাদের প্রতি চরম খিদমত ও আনুগত্য
উস্তাদ ও পীর-মুর্শিদের প্রতি তাঁর খেদমত ও আনুগত্য ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি উস্তাদ মখদুম শেখ সাদ-উদ-দ্বীন খায়রাবাদীর চরণে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। একদিন উস্তাদ তাঁকে স্নেহভরে বললেন, ‘তুমি বাবুর্চিখানায় সাধারণ ছাত্রদের সাথে আলাদা খেও না। এখন থেকে প্রতিদিন আমার সাথে একই দস্তরখওয়ানে খাবার খাবে।’ উস্তাদের এই নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে প্রতিদিন তাঁর সাথে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতেন। অনেক সময় উস্তাদের আসতে দীর্ঘ বিলম্ব হতো, তবুও উস্তাদের নির্দেশ অমান্য করে আগে খেতেন না এবং ক্ষুধার তীব্র কষ্ট সহ্য করে পরম আদবের সাথে বসে থাকতেন।

বাইয়াত, চিল্লাহ্-কশী ও বেলায়েতের উচ্চ মাকাম
শিক্ষা সমাপনের পর উস্তাদের হাতেই তরিকতের বাইয়াত গ্রহণ করেন। এরপর পীর ও মুর্শিদ হযরত মখদুম শেখ সাদ-উদ-দ্বীন রাহমাতুল্লাহি আলাইহির নির্দেশক্রমে যখন চিল্লাহ্-কশীতে (একান্ত আধ্যাত্মিক সাধনায়) বসলেন, তখন সাধনার মাত্র তৃতীয় দিনেই তাঁর জন্য আত্মিক বিজয় ও ঐশ্বরিক রহস্য উন্মোচিত হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত ঊর্ধ্বজগত (উলোভিয়াত) ও নিম্নজগতের (সিফলিদাত) গোপন রহস্যসমূহ তাঁর অন্তর্দৃষ্টির সামনে প্রকাশ পেয়ে গেল। আধ্যাত্মিকতার সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উন্নতি লাভ করতে লাগলেন এবং বেলায়েতের সর্বোচ্চ মাকামে (স্তরে) সমাসীন হলেন।

খেলাফত লাভ ও মক্বরবুন মর্যাদা
এই অলৌকিক আত্মিক উন্নতি ও যোগ্যতা দর্শন করে পীর সাহেব হযরত মখদুম শেখ সাদ-উদ-দ্বীন তাঁকে খেলাফত বা তরিকতের প্রতিনিধিত্ব করার অনুমতি প্রদান করেন। খেলাফত লাভের পর সমসাময়িক অন্যান্য সকল খলিফাদের আধ্যাত্মিক জ্ঞানে ছাড়িয়ে যান এবং পবিত্র কুরআনের বাণী অনুযায়ী ‘আস-সাবিকুনাস সাবিকুন, উলাইকাল মুক্বাররাবুন’ অর্থাৎ (অগ্রগামীরা তো অগ্রগামীই, তারাই আল্লাহর পরম নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা)-এর সর্বোচ্চ মাকামে উন্নীত হন।

প্রথম কারামত: অত্যাচারী হাকিম ও ‘সাফি গার’ 
সাফিপুরের এক বৃদ্ধা নারী হযরতের পরম ভক্ত ছিলেন। তৎকালীন এক অত্যাচারী শাসক বা হাকিম ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জোরপূর্বক সেই অসহায় বৃদ্ধার পৈতৃক বাড়িটি দখল করে নিজের বিলাসবহুল বাড়ির সীমানার ভেতর ঢুকিয়ে নেয়। বৃদ্ধা নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর দরবারে এসে ফরিয়াদ জানালেন। তিনি লোক মারফত পর পর ৩ বার সেই হাকিমের কাছে কড়া বার্তা পাঠালেন যে, ‘বৃদ্ধার ওপর জুলুম করো না, তার বাড়িটি সসম্মানে ছেড়ে দাও।’ কিন্তু সে রাজকীয় ক্ষমতার অহংকারে হুজুরের কথা পাত্তাই দিল না। তখন তিনি মুখ থেকে একটি পাত্রে পানের পিক নিয়ে সেই বৃদ্ধাকে দিয়ে বললেন, ‘যাও, সেই অত্যাচারী হাকিমের বাড়ির ওপর এই পানের পিক ফেলে দিও।’
তাঁর পীর ও মুর্শিদ হযরত মখদুম শেখ সাদ-উদ-দ্বীন (রহ.) কাশফের মাধ্যমে বিষয়টি তৎক্ষণাৎ জানতে পারলেন। তিনি দ্রুত বৃদ্ধাকে নিজের কাছে ডেকে তার হাত থেকে পানের পিক নিজের জিম্মায় নিয়ে নিলেন। এরপর পীর সাহেব নিজে সেই হাকিমের বাড়ির সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘তুমি আমার সাফির সুপারিশ মানোনি। এই পানের পিক সে একে (বৃদ্ধাকে) দিয়েছিল।’ এই কথা বলে হযরত মখদুম শেখ সাদ-উদ-দ্বীন পানের পিক হাকিমের বাড়ির পাশের ঘাসের ওপর ফেলে দিলেন। অলৌকিকভাবে মুহূর্তের মধ্যে সেই কাঁচা ঘাস আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল এবং সেই স্থানের মাটি কয়েকটা আস্ত বাঁশের দৈর্ঘ্যের সমান গভীর খাঁদে ধ্বসে গেল। এরপর পীর সাহেব হাকিমকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘যদি এই বৃদ্ধা আমার সাফির পানের পিক তোমার ঘরের ভেতর বা ছাদের ওপর ফেলে দিত, তবে মানুষ ও পরিবারসহ তোমার পুরো রাজপ্রাসাদ পুড়ে ছাই হয়ে চিরতরে মাটির নিচে ধ্বসে যেত।’ এই ভয়ঙ্কর ও অলৌকিক দৃশ্য দেখে হাকিম ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে লজ্জিত হলো। সে বৃদ্ধার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল এবং তার জমি তৎক্ষণাৎ ফিরিয়ে দিল। যে স্থানে ঘাস পুড়ে ছাই হয়েছিল এবং মাটি ধ্বসে গভীর খাঁদ তৈরি হয়েছিল, সেই স্থানটি আজো ‘সাফি গার’ বা সাফির গর্ত নামে মানুষের কাছে পরিচিত।

দ্বিতীয় কারামত: বাঘের মুখ থেকে ভক্তের প্রাণ রক্ষা
বিখ্যাত ‘মখজানুল আসরার ফি সালাসিলুল কিবার’ গ্রন্থের লেখক হযরত শেখ মুহাম্মদ আরিফ তাঁর কিতাবে একটি বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করে লিখেছেন যে, ‘আমার পরম শ্রদ্ধেয় দাদা শেখ কামাল-উদ-দ্বীনকে হযরত মখদুম সাফি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজের পবিত্র খিরকা (খেলাফতের বিশেষ পোশাক) দান করেছিলেন।’ হযরত শেখ মুহাম্মদ আরিফ বর্ণনা করেন, ‘আমার পিতা একবার নিজগ্রাম থেকে সাফিপুরের উদ্দেশ্যে আসরের নামাজের সময় রওনা হয়েছিলেন। পথের মাঝে একটি বিশাল দিঘি বা পুকুর পড়ল, যা প্রচণ্ড খরায় একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। তিনি যখন সেই দিঘির তলদেশ পার হচ্ছিলেন, ঠিক তখন দুটো হিংস্র নেকড়ে বাঘ গর্জন করতে করতে তাঁর সামনে চলে এলো। আমার পিতা আত্মরক্ষার্থে তাঁর কুর্তার দামান কোমরে শক্ত করে গুঁজে নিলেন এবং দুটো মাটির শক্ত ঢেলা বা পাথর হাতে তুলে নিলেন যেন নেকড়েগুলোকে আঘাত করতে পারেন। কিন্তু বাঘ দুটো যখন একদম কামড় দেয়ার মতো দূরত্বে চলে এলো, তখন তিনি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন এবং ভাবলেন, একটিকে পাথর মারলে অন্যটি তো আমাকে ছিঁড়ে খাবে। এই নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তিনি আকুল হয়ে চিৎকার করে ডেকে উঠলেন, ‘ইয়া মখদুম সাফি, মাদাদ কিজিয়ে’ (হে আমার মুর্শিদ মখদুম সাফি, আমাকে সাহায্য করুন)।
সাহায্যের জন্য ডাকার সাথে সাথেই তিনি অলৌকিকভাবে দেখতে পেলেন যে, হযরত মখদুম সাফি নিজের লাঠি নিয়ে সেখানে সশরীরে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি বাঘগুলোকে তাড়িয়ে দিলেন এবং আমার পিতাকে পরম হেফাজতে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বললেন, ‘যাও, তোমাকে আল্লাহর হাওলা করলাম (আল্লাহর জিম্মায় সঁপে দিলাম)।’ পরের দিন আমার দাদা যখন কৃতজ্ঞতাস্বরূপ দরবারে কিছু নজরানা পাঠালেন, তখন হযরত মখদুম সাফি মৃদু হেসে বললেন, ‘শেখ কামাল-উদ-দ্বীন আমার গতকালকের বাঘ তাড়ানোর মজুরি পাঠিয়েছেন।’

তৃতীয় কারামত: নোনা পানি মিষ্টি হওয়া
সাফিপুরে একটি প্রাচীন কুয়ো বা কুয়া খনন করা হয়েছিল, যার নাম ছিল ‘মিথওয়া’। যখন সেই কুয়াটির খনন কাজ সম্পন্ন হলো এবং মানুষ পানি তুলতে গেল, তখন দেখা গেল তার পানি অত্যন্ত নোনা ও পানের অযোগ্য। স্থানীয় তৃষ্ণার্ত লোকজন দলবেঁধে এসে হযরতের কাছে এই সমস্যার কথা জানিয়ে আরজি পেশ করলেন। তিনি দয়াপরবশ হয়ে মুখ‌ থেকে পানের পিক তাদের হাতে দিলেন এবং বললেন, এটি কুয়ার পানিতে ফেলে দিতে। পানের পিক যখন ওই লোনা কুয়োর পানির মধ্যে ফেলা হলো, তখন আল্লাহর কুদরতে ও অলৌকিকভাবে সেই লোনা পানি সাথে সাথে অত্যন্ত মিষ্টি, সুস্বাদু ও সুপেয় পানিতে পরিণত হয়ে গেল।

সিলসিলা ও পীর-মুর্শিদ
হযরত মখদুম শাহ সাফি আব্দুস সামাদ (রহ.) ছিলেন তরিকতের জগতে চিশতিয়া ধারার প্রবাদপুরুষ। তিনি হযরত কুতুবুল আলম মখদুম শেখ সাদ-উদ-দ্বীন খায়রাবাদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রধান মুরিদ এবং খলিফা ছিলেন। তাঁর মাধ্যমে পৃথিবীতে তাসাউউফের এক অনন্য শাখা ‘চিশতিয়া সাফভী’ সিলসিলা জারি হয়েছে, যা আজো লাখ লাখ মানুষকে খোদার পথ দেখাচ্ছে।

প্রধান খলিফাবৃন্দ
তাঁর কাছ থেকে খেলাফত ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করে যারা বিশ্বজুড়ে ইসলাম প্রচার করেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রধান ১৭ জন খলিফা হলেন:
০১. হযরত শেখ শাহ বন্দেগী মুবারক জাজমভী
০২. হযরত মখদুম সৈয়দ নিজাম-উদ-দ্বীন আল্লাহদিয়া খায়রাবাদী
০৩. হযরত শেখ শাহ ফজলুল্লাহ গুজরাটি
০৪. হযরত শেখ হুসাইন মুহাম্মদ সিকান্দারাবাদী
০৫. হযরত শেখ মুবারক সান্দিলভী
০৬. হযরত শেখ মাহমুদ মানু জগোয়ারী
০৭. হযরত শেখ আল্লাহ-দেহ জানুলী
০৮. হযরত সৈয়দ হাসান মুহাম্মদ
০৯. হযরত শেখ হাজী মান্ধনী আসিয়ুনী
১০. হযরত শেখ জান সান্ধভী
১১. হযরত সৈয়দ তা-হা বিলগ্রামি
১২. হযরত শেখ পেয়ারে কাঞ্জভী
১৩. হযরত শেখ আবুল ফাতাহ আসিয়ুনী
১৪. হযরত শেখ জানু কাকোরী
১৫. হযরত সৈয়দ জায়ু মুহানী
১৬. হযরত শেখ আব্দুল গনি ফতেহপুরী
১৭. হযরত শেখ কামাল-উদ-দ্বীন।

ওফাত ও পবিত্র মাজার শরিফ
আধ্যাত্মিক জগতের এই মহান সাধক ও পথপ্রদর্শক দীর্ঘকাল দ্বীনের খেদমত শেষে ১৮ই মহররম ৯৪৫ হিজরি (মোতাবেক জুন ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ) সনে ইহধাম ত্যাগ করে মহান রব্বুল আলামীনের সান্নিধ্যে গমন করেন। ভারতের উত্তরপ্রদেশের ঐতিহাসিক ‘সাফিপুর’ নামক স্থানে তাঁর পবিত্র মাজার শরিফ অবস্থিত, যেখানে প্রতি বছর লাখো ভক্তের সমাগম ঘটে।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত