মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী (রহ.) কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনেই নেতৃত্ব দেননি, বরং ইসলামের সুমহান আদর্শ, ত্যাগ ও সুফি ভাবধারাকে গণমানুষের স্বাধিকার আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রূপ দিয়েছিলেন। পবিত্র মহররম মাস ও আশুরার মহান শিক্ষাকে তিনি যেভাবে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্র-জনতার মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন—তা বাঙালির ইতিহাসে এক অনন্য ও কালজয়ী অধ্যায়।
মওলানা হোসেনের স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধ অবলম্বনে সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মওলানা ভাসানীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে উদযাপিত মহররমের সেই ঐতিহাসিক দিনগুলোর বিবরণ নিচে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হলো:
প্রতীকী তোরণ নির্মাণ
মহররম মাস শুরু হতেই মওলানা ভাসানী তাঁর ভক্ত ও মুরিদদের নিয়ে টাঙ্গাইলের সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করতেন। আহলে বায়তের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে তিনি কারবালার মহান শহীদ ও পবিত্র ব্যক্তিত্বদের স্মরণে পৃথক পৃথক সুদৃশ্য তোরণ নির্মাণ করাতেন:
হযরত মা ফাতেমা (রা.) তোরণ
হযরত আলী (রা.) তোরণ
হযরত ইমাম হাসান (রা.) তোরণ
হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) তোরণ
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল, এই চার তোরণের ঠিক মাঝখানে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নির্মিত হতো হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র নামের প্রধান তোরণ। এটি মূলত ইসলামের মূল ধারার সাথে আহলে বায়তের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের এক চমৎকার প্রতীকী প্রকাশ ছিল।
প্রথম ১০ দিনের জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্য প্রতিযোগিতা
মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন সন্তোষে নিয়মিত বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। হুজুর ভাসানীর উপস্থিতিতে আয়োজিত এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল: মহররম ও আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা সভা। পবিত্র কোরআনখানি, দুরুদ ও মিলাদ মাহফিল এবং সর্বসাধারণের মাঝে শিরনি বিতরণ। সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মহররম সম্পর্কিত বিখ্যাত লেখক-লেখিকাদের প্রবন্ধ ও কবিতা পাঠের প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে, সাম্য ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ‘মহররম’ কবিতা পাঠের প্রতিযোগিতা ছিল এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
ইয়াজিদি শক্তির বিরুদ্ধে স্লোগান ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মিছিল
মওলানা ভাসানী কারবালার ইতিহাসকে কেবল অতীতের একটি ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখতেন না; তিনি একে বর্তমান যুগের জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের চিরন্তন লড়াইয়ের আদর্শ মনে করতেন। ছাত্র-ছাত্রী ও জনতার মিছিলে তখন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ‘আধুনিক যুগের ইয়াজিদি ও ফেরাউনি শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করে স্লোগান দেওয়া হতো। সন্তোষের আকাশ-বাতাস তখন মুখরিত হতো এই কালজয়ী স্লোগানগুলোতে:
“ইয়াজিদি শক্তি – ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক!”
“মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ – নিপাত যাক, নিপাত যাক!”
“দুনিয়ার মজলুম – এক হও, এক হও!”
“ইমাম হোসাইনের আদর্শ – জাগ্রত হোক, জাগ্রত হোক!”
শেষ তিন দিনের প্রতীকী রণকৌশল ও লাঠিখেলা
আশুরার দুই দিন আগে থেকে শুরু করে ১০ই মহররম (আশুরা) পর্যন্ত সন্তোষে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হতো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দলে দলে ইমাম হোসাইন (রা.) প্রেমিক জনতা সন্তোষে ছুটে আসত। তাঁরা ঘোড়ায় চড়ে এবং পায়ে হেঁটে লাঠিখেলা, ঢাল-তলোয়ার চালানোর মাধ্যমে কারবালার ময়দানে ইয়াজিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইমাম হোসাইনের প্রতীকী যুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ কসরত (প্রদর্শন) দেখাতেন। লাঠিখেলা শেষে হুজুর ভাসানী নিজে বিজয়ী দলসহ অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকটি দলকে পুরস্কৃত করে উৎসাহিত করতেন। এই সময় টাঙ্গাইল শহরের ব্যান্ড পার্টি ও সানাইয়ের করুণ সুর সন্তোষের পরিবেশকে এক পরম শোকাবহ ও আধ্যাত্মিক আবেশে একাকার করে দিত।
বর্তমানের শূন্যতা
হাজার হাজার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। এই আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ইসলামের ইতিহাস, কারবালার মাহাত্ম্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকার বাস্তব শিক্ষা লাভ করতো, যা তাঁদের হৃদয়ে চিরদিনের মতো দাগ কেটে যেত।
আজ মওলানা ভাসানী হুজুরের প্রত্যক্ষ ও অভিভাবকসুলভ তত্ত্বাবধানের অভাবে সন্তোষের সেই আদর্শিক, উজ্জীবিত ও বিপ্লবী ধারার মহররমের অনুষ্ঠানগুলো হারিয়ে গেছে। কিন্তু সুফি আদর্শ ও মজলুমের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাঁর এই অনন্য উদ্যোগ ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
(মওলানা ভাসানীর বংশধর আজাদ খান ভাসানীর ফেসবুক পোস্ট থেকে মোহাম্মদ হোসেন রচিত নিবন্ধ থেকে সংগৃহীত।)