চট্টগ্রামের বারো আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ মোহসেন আউলিয়ার মাজার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ একটি স্থান। সেখানে কেবল মাজার নয়, রয়েছে শাহ মোহসেন আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত একটি কালো পাথর। মোহসেন আউলিয়ার মাজার ও এই পাথরের ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা।
জনশ্রুতি রয়েছে, শাহ মোহসেন আউলিয়া এই পাথরের উপর ভেসে ভেসে সমুদ্র পথে আরব থেকে চট্টগ্রামে আগমন করেন। যেখানে তিনি আস্তানা গাড়েন সেখানে এই পাথরটি তিনি স্থাপন করেন। যে কারণে এই কালো পাথরটি দরগাহে আগত ভক্তবৃন্দের নিকট শত শত বছর ধরে অত্যন্ত বরকতময় ও নেয়ামতের উসিলা হিসেবে শ্রদ্ধার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ থেকে জানা যায়, একসময় এই পাথর ধোয়া পানি মানুষ অত্যন্ত পবিত্র মনে নেক নিয়ত সহকারে তাবারুক হিসেবে পান করতেন। এই পানির জন্য দরগাহে আগত ভক্তবৃন্দ অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতেন। অনেকে কঠিন, জটিল রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় এই পানি করতেন। অনেক মানুষ রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।

ঐতিহ্য অনুসন্ধানী বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এ বিষয়ে লিখেছেন, “শাহ সাহেব গৌড় হইতে আগমনকালে যে বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড সঙ্গে আনিয়াছিলেন, এই বারাণ্ডার নিম্নবর্তী প্রাচীরের উপর তাহা রক্ষিত হইয়াছে। প্রস্তরখণ্ড প্রায় ২.৪/৩ (পৌনে তিন) হাত হইবে। উহা কৃষ্ণ মর্মরপ্রস্তর বলিয়া বোধ হয়। উহাতে আরবী অক্ষরের মত এক প্রকার অক্ষরে কি লিখিত আছে। এ অঞ্চলের কেহ তাহার পাঠোদ্ধার করিতে পারেন নাই। শুনা যায়, জনৈক ইংরেজ রাজকর্মচারী উহার পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। কথিত আছে, এই প্রস্তরখণ্ডে বসিয়া শাহ সাহেব ভগবদারাধনায় নিমগ্ন হইতেন। এই ঐতিহাসিক তত্ত্বোদ্ধারের যুগে এই প্রস্তর-লিপি অদ্যাপি অপরিজ্ঞাত ও অপরিচিত রহিয়াছে, ইহা নিতান্ত ক্ষোভের কথা।” অর্থাৎ তাঁর দাবি, এই পাথরে শাহ মোহসেন আউলিয়া ভেসে আসেননি, বরং তিনি তৎকালীন বাংলার রাজধানী গৌড় থেকে আসার সময় এই পাথর সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন।
কিন্তু পাথরে আরবি লেখার কথাটি সত্য। সাহিত্য গবেষক ও পণ্ডিত ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক এই লেখার কিছুটা উদ্ধার করেছিলেন।
এই পাথরটি ধুয়ে পানি খেতে খেতে এমনভাবে ক্ষয় হয়ে গিয়েছিল যে, এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দরগাহ কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বর্তমানে পাথরটি একটি গ্লাসে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে, দর্শনার্থীরা দেখতে পারেন কিন্তু আগের মতো হরেদরে ব্যবহার করতে পারেন না। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পাথরটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই ব্যবস্থাটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচ্য।