১৯২১ সালে যে ঘটনার প্রতিবাদে নজরুল লিখেছিলেন কোরবানি নিয়ে সুদীর্ঘ কবিতা

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরবিদ্রোহী ও সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষুরধার লেখনী সবসময় অন্যায়, কুসংস্কার ও সুফি-ইসলামি ঐতিহ্যের বিকৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। কবি নজরুলের তেমনই এক কালজয়ী ও তাত্ত্বিক সৃষ্টি তাঁর বিখ্যাত ‘কোরবানি’ কবিতাটি। বাংলা ১৩২৭ বঙ্গাব্দে (ইংরেজি ১৯২১ সালে) বিখ্যাত ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত সুদীর্ঘ এই কবিতাটি রচনার পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক এবং তীব্র প্রতিবাদী প্রেক্ষাপট, যা মূলত কোরবানির আধ্যাত্মিক ও ত্যাগের মহিমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জবাবে রচিত হয়েছিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নজরুলের গর্জন:
ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, রংপুরের আইনজীবী এবং পবিত্র কুরআন শরীফের স্বনামধন্য অনুবাদক মৌলবী তসলীমুদ্দীন আহমদের পুত্র তালীমুদ্দীন আহমদ তৎকালীন সময়ে একটি বিতর্কিত প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ১৩২৭ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে বিখ্যাত ‘সবুজপত্র’ পত্রিকায় ‘আজ ঈদ’ শিরোনামে প্রকাশিত সেই প্রবন্ধে কোরবানি উপলক্ষে পশু জবাই নিয়ে তীব্র কটূক্তি করা হয়। প্রকারান্তরে, ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান এবং সুফি দর্শনের অন্যতম মূল স্তম্ভ—ত্যাগের এই পবিত্র রীতির যৌক্তিকতাকেই আধুনিকতার নামে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল সেই লেখায়।
ধর্মের মূল সুর ও আধ্যাত্মিক চেতনা না বুঝে কোরবানির মতো একটি পবিত্র আত্মশুদ্ধিমূলক ইবাদতকে কেবল ‘পশু হত্যা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এই অবৈজ্ঞানিক ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণাকে মেনে নিতে পারেননি তরুণ নজরুল। এই অপপ্রচারের তাৎক্ষণিক ও দাঁতভাঙা জবাব দিতেই তিনি ধারণ করলেন রুদ্ররূপ এবং রচনা করলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘কোরবানি’।

কবিতার মূল বাণী: ‘হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদবোধন’:
নজরুল তাঁর কবিতায় অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করলেন যে, কোরবানি কোনো অন্ধ রক্তপাত বা নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ নয়; বরং এটি হলো সত্যের পক্ষে নিজের নফস বা অহংকারকে বিলিয়ে দিয়ে এক মহান ‘সত্যাগ্রহ’ ও আত্মিক শক্তির উদ্বোধন। তিনি লিখলেন:

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুব্ধ মন!
ধ্বনি উঠে রণি’ দূর বাণীর, –
আজিকার এ খুন কোরবানীর!
দুম্বা-শির রুম্-বাসীর
শহীদের শির সেরা আজি!- রহমান কি রুদ্র নন?
ব্যাস! চুপ খামোশ রোদন!
আজ শোর ওঠে জোর “খুন দে, জান দে, শির দে বৎস” শোন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
খন্জর মারো গর্দ্দানেই,
পন্জরে আজি দরদ্ নেই,
মর্দ্দানী’ই পর্দা নেই,
ডরতা নেই আজ খুন্-খারাবীতে রক্ত-লুব্ধ-মন!
খুনে খেলবো খুন্-মাতন!
দুনো উনমাদনাতে সত্য মুক্তি আনতে যুঝবো রণ।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
চ’ড়েছে খুন আজ খুনিয়ারার
মুসলিমে সারা দুনিয়াটার!
‘জুলফেকার’ খুলবে তার
দু’ধারী ধার শেরে-খোদার , রক্তে-পূত-বদন!
খুনে আজকে রুধবো মন
ওরে শক্তি-হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন্।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
আস্তানা সিধা রাস্তা নয়,
‘আজাদী মেলে না পস্তানো’য়!
দস্তা নয় সে সস্তা নয়!
হত্যা নয় কি মৃত্যুও? তবে রক্তে লুব্ধ কোন্_
কাঁদে-শক্তি-দুস্থ শোন—
“এয়্ ইবরাহীম্ আজ কোরবানী কর শ্রেষ্ঠ পুত্র ধন!”
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
এ তো নহে লহু তরবারের
ঘাতক জালিম জোরবারের
কোরবানের জোরজানের
খুন এ যে, এতে গোদ্র্দ ঢের রে, এ ত্যাগে ‘বুদ্ধ’ মন!
এতে মা রাখে পুত্র পণ!
তাই জননী হাজেরা বেটারে পরা’লো বলির পূত বসন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
এই দিনই ‘মিনা’-ময়দানে
পুত্র-স্নেহের গর্দানে
ছুড়ি হেনে ‘খুন ক্ষরিয়ে নে’
রেখেছে আব্বা ইবরাহীম সে আপনা রুদ্র পণ!
ছি ছি! কেঁপোনা ক্ষুদ্র মন!
আজ জল্লাদ নয় , প্রহ্লাদ-সম মোল্লা খুন-বদন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
দ্যাখ্ কেঁপেছে ‘আরশ’ আসমানে
মন-খুনী কি রে রাশ মানে?
ত্রাস প্রাণে? তবে রাস্তা নে!
প্রলয় বিষাণ ‘কিয়ামতে’ তবে বাজবে কোন্ বোধন?
সে কি সৃষ্টি-সংশোধন?
ওরে তাথিয়া তাথিয়া নাচে ভৈরব বাজে ডম্বরু শোন্!—
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
মুসলিম-রণ-ডঙ্কা সে,
খুন দেখে করে শঙ্কা কে?
টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে,
ওরে হুঙ্কারে, ভাঙি গড়া ভীম কারা, ল’ড়বো রণ-মরণ!
ঢালে বাজবে ঝন্-ঝনন্!
ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
জোর চাই, আর যাচনা নয়,
কোরবানী-দিন আজ না ওই?
কাজ না আজিকে জান্ মাল দিয়ে মুক্তির উদ্র্ধরণ?
বল্– “যুঝবো জান ভি পণ!”
ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ,
আজ আল্লার নামে জান্ কোরবানে ঈদের পূত বোধন।

 

নজরুল এই কবিতায় বলতে চেয়েছেন, কোরবানির মুখ্য বিষয় জেগে উঠা প্রাণশক্তিতে। পশুর সঙ্গে কোরবানি দিতে হবে নিজেদের ভীরুতা, কাপুরুষতা এবং জড়তাকেও। ধর্মের মর্ম না বুঝে কেবল লোকদেখানো মানসিকতা থেকে কোরবানি দিলে ফায়দা হবে না। তাই ত্যাগের এ চেতনাকে ধারণ করেই দিতে হবে কোরবানি এবং উজ্জীবিত হতে হবে জীবনযাত্রায়। তাহলেই হাসিল হবে কোরবানির আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

তাসাউফ বা সুফি দর্শনের গভীর আলোকে কবি স্পষ্ট করেছেন যে, ধর্মের প্রকৃত মর্ম ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা না বুঝে কেবল লোকদেখানো মানসিকতা বা গোশত খাওয়ার উৎসব হিসেবে কোরবানি দিলে কোনো ফায়দা হবে না। আল্লাহর নামে নিজের জান ও মাল উৎসর্গ করার যে ‘পূত বোধন’ বা পবিত্র চেতনা, তাকে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে ধারণ করতে হবে। তবেই অর্জিত হবে স্বাধীনতার প্রকৃত মুক্তি এবং হাসিল হবে কোরবানির আসল লক্ষ্য ও পরম উদ্দেশ্য। শত বছর পেরিয়ে আজও নজরুলের এই কবিতাটি মুসলিম সমাজের জন্য কোরবানি উদযাপনের সবচেয়ে বড় আত্মিক ও তাত্ত্বিক দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচ্য।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত