৩৬০ আউলিয়ার দেশ বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফি হযরত শাহজালাল। তিনি সিলেট জয় করেছেন ঠিক কিন্তু তাঁর সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়া সারা বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ইসলাম প্রচার-প্রসারে একযোগে কাজ করেছেন। তাঁর সিলেট বিজয় ও সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার কার্যক্রমের মাধ্যমে মুঘল আমলের পূর্বেই বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ইসলামের ছায়াতলে সমবেত হয়। যে কারণে সারা বাংলায় হযরত শাহজালাল ও ৩৬০ আউলিয়ার ইতিহাস, কিংবদন্তি ও প্রভাব অদ্যাবধি বিদ্যমান। ৩৬০ আউলিয়ার সঙ্গী হিসেবে হযরত শাহজালালই বাংলার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয়তম সুফি হিসেবে স্বীকৃত। যার একটি প্রকাশমাধ্যম হলো মাজার জেয়ারত। বাংলাদেশের এমন কোনো রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি দায়িত্ব গ্রহণ করার পর হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করেননি। আর সিলেটের এমপি, মন্ত্রী সহ যত ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ থাকেন তাদের কথা বলাই বাহুল্য!
হযরত শাহজালালের মাজারে রাজা-বাদশাহ ও ক্ষমতাসীনদের জেয়ারতের রেওয়াজ আজকের বা একশো বছর আগের কথা নয়, বরং শত শত বছরের প্রাচীন রেওয়াজ। ইতিহাস ও ঐতিহ্যমূলক গবেষণায় যার বর্ণনা পাওয়া যায়।
সুলতানী আমলের বিখ্যাত সুলতান জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ, যিনি রাজা গণেশের পুত্র ও হযরত নূর কুতুবুল আলমের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহের পুত্র আহমদ শাহ’র আমলে সিলেটের শাসক ছিলেন মকবুল খান। তিনি হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করেন। কেবল জেয়ারতই করেননি, তার কবরও রয়েছে হযরত শাহজালালের মাজারের পাশে।
সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ যখন সোনারগাঁয়ের শাসনকর্তা ছিলেন তখন তার তত্ত্বাবধানে মাজার সংলগ্ন একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। ধারণা করা হয়, তিনিও সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং মাজার জেয়ারত করেছেন।
আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে তৎকালীন মুয়াজ্জামবাদের সেনাপতি হলাও খান ১৫০৫ সালে স্বপ্নে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করেন। অতঃপর সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে মসজিদটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু মসজিদের একটি শিলালিপি কর্তৃপক্ষের নিকট সংরক্ষিত আছে।
১৬০৬ সালে সিলেটের ফৌজদার লুৎফুল্লাহ সিরাজী মাজার শরীফ সংলগ্ন একটি প্রাচীর নির্মাণ করেন। তিনিও সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং মাজার জেয়ারত করেন।
১৬৭৮ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব কর্তৃক আদেশপ্রাপ্ত হয়ে সিলেটের তৎকালীন ফৌজদার ফরহাদ খাঁ কর্তৃক দরগাহ শরীফে এক গম্বুজবিশিষ্ট একটি অট্টালিকা নির্মাণ করেন। তিনিও ফৌজদার থাকাবস্থায় হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করেছেন।
ঢাকার বিখ্যাত হোসেনী দালানের নির্মাতা মীর মুরাদ বক্স ছিলেন মুঘলদের মীর বহর-ই-নওয়ারা, অর্থাৎ নৌ-সেনাপতি। তিনি ১৬৯৫ সালে হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করেন। জেয়ারতের পর দরবারের লঙ্গরখানার জন্য দুটি বৃহৎ আকৃতির ডেগ/পাতিল তৈরি করে হাদিয়া দেন। উল্লেখ্য, দরগাহ শরীফে এখনো ওরস, শবে বরাত ও লাকড়ি তোড়া উৎসব উপলক্ষে উক্ত পাতিলে খাবার প্রস্তুত করা হয়।
১৬৯৯ সালে সিলেটের তৎকালীন ফৌজদার আব্দুল্লাহ সিরাজী দরগাহ শরীফের পূর্বদিকে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এটিও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মসজিদ নির্মাণকালে আব্দুল্লাহ সিরাজী দরবারে এসে মাজার জেয়ারত করেন।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথমদিকে সিলেটের বিখ্যাত রেসিডেন্ট মিস্টার জন উইলিস একটি জালালি কবুতরের উপর গুলি করার কারণে তার ডান হাত অবশ হয়ে যায়। অতঃপর সুস্থ হবার উদ্দেশ্যে তিনি হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করেন এবং দরগাহ সংলগ্ন মসজিদ, এক গম্বুজবিশিষ্ট অট্টালিকা সংস্কার করেন।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথমদিকে কীভাবে সিলেটে নিয়োজিত কালেক্টরগণ হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করতেন তার বর্ণনা দিয়েছেন রবার্ট লিন্ডসে। তিনি নিজেও ছিলেন সিলেটের একজন কালেক্টরেট। তিনি লিখেছেন (বাংলা অনুবাদ): “প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী আমি খালি পায়ে দরগা শরীফে গিয়ে পাঁচটি স্বর্ণমুদ্র নেয়াজ হিসেবে দিয়ে আসি। অতঃপর অভিষিক্ত হয়ে ফিরে প্রজাদের আনুগত্য গ্রহণ করি। এই সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান হতে দর্শনার্থীরা দরগা শরীফে মাজার জিয়ারত করতে আসতেন। এবং নতুন কালেক্টরেট আসলেই তার প্রধান ও প্রথম কর্তব্য ছিল দরগাহ শরীফে জিয়ারত করে হযরত শাহজালালের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।”
রবার্ট লিন্ডসের এই উক্তি থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, হযরত শাহজালালের ইন্তেকালের পর থেকেই সুলতানী, মুঘল, ইংরেজ উপনিবেশ— সবসময়ই সেখানকার প্রশাসকদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য ছিল হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করা। এটাই ছিল সিলেটের শাসনভার গ্রহণের রেওয়াজ। এটিকে অলিখিত বিধি বললেও অত্যুক্তি হয় না।
১৮৪৯ সালে দিল্লির শেষ মুঘল সম্রাট শাহ আলমের দৌহিত্র (নাতি) মির্জা ফিরুজ শাহ্ সিলেটে এসে হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করেন। তিনিই মুঘল বংশের শেষ সদস্য যিনি হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করে তার বংশের জন্য দোয়া করেছিলেন।
পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারির পর যখন সিলেটে গিয়েছিলেন, সর্বপ্রথম হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করেছেন।
এভাবে বাংলাদেশ আমলেও রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারতের রেওয়াজ জারি রেখেছেন। বাংলাদেশের এমন কোনো রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করেননি। আর সিলেটের এমপি, মন্ত্রীদের জেয়ারতের কথা বলাই বাহুল্য। দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ যখনই সিলেটে সফর করেন, তাদের প্রথম কাজ হয় হযরত শাহজালালের মাজার জেয়ারত করা। এটিই সিলেটে প্রবেশ ও সেখানকার জনগণের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক তৈরির প্রধান রীতি।
আটশো বছর ধরে জারি থাকা এই রীতিই প্রমাণ করে, আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী অলি আউলিয়াগণ এখনো বাংলার মুসলমান সমাজের কেন্দ্র হিসেবেই বিদ্যমান।
(১৯৮৪ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত আলী মাহমুদ খান রচিত প্রাচ্য সূর্য হযরত শাহজালাল (রঃ) গ্রন্থ থেকে তথ্যাবলী সংগ্রহ করা হয়েছে।)