সিলেটের আধ্যাত্মিক রাজধানী দরগাহ-এ-হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ওরস মানেই লাখো ভক্তের মিলনমেলা। আর এই ওরসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘শিন্নি’ বা তবারক। তবে এই শিন্নি রান্নার প্রতিটি পর্যায় এবং এর হিসাব রাখার পদ্ধতিতে মিশে আছে শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য, যা সাধারণ মানুষের কাছে আজও এক বিস্ময়।
মুতাওয়াল্লি সাহেবের হাতে আগুনের ছোঁয়া:
শিন্নি রান্নার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় এক বিশেষ গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে। ওরসের নির্ধারিত সময়ে মাজারের বিশাল পাকশালায় গিয়ে মুতাওয়াল্লি সাহেব নিজে চুলার কাছে এগিয়ে আসেন। প্রথা অনুযায়ী তাঁর হাতেই জ্বলে ওঠে চুলার প্রথম আগুন। এরপরই শুরু হয় বিশাল কর্মযজ্ঞ।

চাল ও মাংসের বিশেষ পরিমাপ:
পাকশালার একপাশে যখন গুদামঘর থেকে একের পর এক চালের বস্তা এসে পৌঁছায়, তখন বিপরীত দিকে সারি সারি বিশাল ডেগচি বসানো হয় চুলায়। এই দুইয়ের মাঝখানে থাকে ঐতিহ্যের এক বিশেষ ‘পরিমাপক’ পাত্র। বছরের পর বছর ধরে এখানে একটি নির্দিষ্ট হিসাব মেনে চলা হয়—দুই পাত্র ভরা চালের জন্য বরাদ্দ এক ডেগচি রান্না। একদিকে মাংসের ডেগচিতে টগবগ শব্দ আর অন্যদিকে ভাতের ডেগচি থেকে ওঠা বাষ্পের উথালপাথাল ঘ্রাণে পুরো মাজার এলাকা এক স্বর্গীয় আমেজ ধারণ করে।

টালি চিহ্নের অনন্য হিসাব:
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো রান্নার হিসাব রাখার পদ্ধতি। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার যুগেও এখানে টিকে আছে প্রাচীন ‘টালি’ পদ্ধতি। এক ডেগচি রান্না শেষ হলে একটি করে লম্বালম্বি দাগ টানা হয়। দশটি দাগ পূর্ণ হলে তৈরি হয় একটি স্তর। আগে এই হিসাবের খাতা ছিল পাকশালার দেয়াল; পাথর বা চুনে কাটা দাগেই সংরক্ষিত হতো শিন্নির পরিমাণ। বর্তমানে সুবিধার জন্য সাদা বোর্ড ব্যবহার করা হলেও দাগ দিয়ে হিসাব রাখার সেই আদি নিয়মটি বদলানো হয়নি।

২৮৫ ডেগচির রেকর্ড:
এবারের ৭০৭তম ওরস শরীফে শিন্নি রান্নার চূড়ান্ত হিসাব দাঁড়িয়েছে ২৮৫ ডেগচিতে। সাদা বোর্ডে নিপুণভাবে আঁকা এই ২৮৫টি দাগ আগামী এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। পরবর্তী ৭০৮তম ওরস শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই বোর্ডটি ভক্তদের জন্য গত ওরসের স্মারক হিসেবে থেকে যাবে।
আধ্যাত্মিকতা আর ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধনই শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহকে যুগ যুগ ধরে অনন্য করে রেখেছে। শিন্নির এই স্বাদ যেমন ভক্তদের হৃদয়ে প্রশান্তি দেয়, তেমনি এর পেছনের এই প্রাচীন পদ্ধতিগুলো বাঁচিয়ে রাখে আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে।
লেখা ও ছবির জন্য শেখ ফাহিম ফয়সালের নিকট দায়বদ্ধ।