জন্ম ও বংশ পরিচয়
হযরত খাজা বন্দে নেওয়াজ গেসু দরাজ (রহ.) ১৩২১ খ্রিস্টাব্দে (৪ রজব ৭২১ হিজরি) ভারতের দিল্লিতে এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও আধ্যাত্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম সৈয়দ মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আল-হুসাইনি। তিনি বংশপরম্পরায় নবী করীম (দ.)-এর পবিত্র বংশধারা বা আহলে বাইতের সদস্য। তাঁর পিতা হযরত সৈয়দ ইউসুফ রাজু কাতালও (রহ.) একজন বড় সুফি সাধক ছিলেন।
উপাধি ‘গেসু দরাজ’
সুফি সাহিত্যে তাঁকে ‘গেসু দরাজ’ নামে ডাকা হয়, যার অর্থ ‘লম্বা জুলফি বা কেশধারী’। কথিত আছে, তাঁর পীর ও মুর্শিদ হযরত নাসিরুদ্দিন চিরাগ-ই-দিল্লি (রহ.)-এর পালকি বহন করার সময় তাঁর দীর্ঘ চুল পালকির হাতলে আটকে গিয়েছিল, কিন্তু মুর্শিদের প্রতি আদব ও ভালোবাসার কারণে তিনি চুল ছাড়ানোর চেষ্টা না করে সেই অবস্থাতেই পালকি বহন করেছিলেন। এই অনন্য ভক্তিতে খুশি হয়ে তাঁর মুর্শিদ তাঁকে ‘গেসু দরাজ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। আর ‘বন্দে নেওয়াজ’ অর্থ হলো ‘সৃষ্টির প্রতি দয়ালু’।
শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক জীবন
তিনি দিল্লির বিখ্যাত আলেম ও সাধকদের সান্নিধ্যে শিক্ষালাভ করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি দিল্লির প্রখ্যাত চিশতী সাধক হযরত নাসিরুদ্দিন চিরাগ-ই-দিল্লি (রহ.)-এর মুরিদ হন। পীরের খেদমতে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে তিনি আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেন এবং পরবর্তীতে তাঁর প্রধান খলিফা হিসেবে মনোনীত হন।
দাক্ষিণাত্যে আগমন ও ইসলাম প্রচার
১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর লং-এর দিল্লি আক্রমণের সময় তিনি দিল্লি ত্যাগ করে দক্ষিণ ভারতের দাক্ষিণাত্যের দিকে যাত্রা করেন। সেখানে বাহমানি সালতানাতের সুলতান ফিরোজ শাহ বাহমানির আমন্ত্রণে তিনি কালবুরগি (বর্তমান কর্নাটক) অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর আগমনে দাক্ষিণাত্যের সামাজিক ও ধর্মীয় চিত্র বদলে যায়। তাঁর উদারতা ও শিক্ষার ফলে হাজার হাজার মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চায় অবদান
তিনি কেবল একজন সাধকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন প্রথিতযশা লেখক ও পণ্ডিত। তিনি ফারসি, আরবি এবং প্রাচীন দখনি উর্দু ভাষায় প্রায় শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন।
আধ্যাত্মিক ধারণাগুলোকে সাধারণ মানুষের ভাষায় পৌঁছে দিতে তিনি ‘দখিনি উর্দু’ ভাষা ব্যবহার করেন, যা এই ভাষার উন্মেষে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
তাঁর রচিত ‘মিরাজুল আশিকিন’ গ্রন্থটি উর্দু সাহিত্যের প্রাচীনতম গদ্যগ্রন্থগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
দর্শন ও আদর্শ
তাঁর প্রচারের মূল ভিত্তি ছিল ‘ইশক-এ-ইলাহি’ (আল্লাহর প্রেম) এবং ‘খিদমতে খালক’ (সৃষ্টির সেবা)। তিনি বলতেন, মানুষের সেবা ছাড়া স্রষ্টাকে পাওয়া অসম্ভব। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ তাঁর খানকায় সমবেত হতো। তাঁর এই সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দক্ষিণ ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বীজ বপন করেছিল।
ওফাত ও উত্তরাধিকার
এই মহান আধ্যাত্মিক সম্রাট ১৪২২ খ্রিস্টাব্দে (১৬ জিলকদ ৮২৫ হিজরি) ১০১ বছর বয়সে কালবুরগিতে ইন্তেকাল করেন। বাহমানি সুলতান আহমেদ শাহ ওয়ালী তাঁর মাজার শরীফটি নির্মাণ করেন। প্রতি বছর সেখানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ওরস শরীফ পালন করা হয়, যেখানে আজও লক্ষ লক্ষ ভক্ত-আশেকান সমবেত হন।
হযরত খাজা বন্দে নেওয়াজ গেসু দরাজ (রহ.)-এর মাজার আজও দক্ষিণ ভারতের এক বিশাল আধ্যাত্মিক কেন্দ্র এবং ঐক্য ও শান্তির মূর্ত প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।