ইতিহাস
বাংলার সঙ্গে, বিশেষত চট্টগ্রামের সঙ্গে রেঙ্গুনের যোগসূত্র ঐতিহাসিক। বেশিদিন আগের কথা নয়, ব্রিটিশ আমলেই বার্মা ও চট্টগ্রামের মধ্যকার সকল প্রকার আদান-প্রদান চলমান ছিল। এই সূত্রে বার্মায় যে সকল বাঙালি মুসলমান ব্যবসায়িক ও অন্যান্য প্রয়োজনে হিজরত করেছিলেন তাঁরা ১৮৬২ সালে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি প্রথমে ছিল কাঠের, অতঃপর পাকা দালানে পরিণত করা হয়েছে। মসজিদটির আনুষ্ঠানিক নাম: বাঙালি সুন্নী জামে মসজিদ। কিন্তু সংক্ষেপে ‘বাঙালি মসজিদ’ নামে পরিচিত।
চট্টগ্রামের না কলকাতার— কোন্ অঞ্চলের মুসলমান জনগোষ্ঠী এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বাঙালি মুসলমানই যে নির্মাণ করেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। যে কারণে মসজিদটি ‘বাঙালি মসজিদ’ নামে ঐতিহাসিকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
বর্তমান অবস্থা ও শিক্ষা কার্যক্রম
মসজিদটির বর্তমান অবস্থা বেশ চমৎকার। ইয়াঙ্গুনের অধিকাংশ মসজিদের মতোই এটি নিয়মিত সংস্কার ও রঙ করার ফলে সর্বদা প্রাণবন্ত থাকে। মসজিদের পাশেই অবস্থিত একটি মাদ্রাসায় ধর্মতত্ত্ব ছাড়াও আরবি এবং বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার কোর্স চালু রয়েছে।
সংকট ও সম্প্রীতির গল্প
মসজিদটির সামনের সড়কটি ২০১২ সালে একটি বিরল প্রতিবাদের সাক্ষী হয়েছিল। রাখাইন রাজ্যে বাসে ১০ জন যাত্রী হত্যার প্রতিবাদে প্রায় ৫০ জন মুসলিম বিক্ষোভকারী এখানে সমবেত হয়েছিলেন। ২০১৩ সাল নাগাদ যখন দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল, তখনও ইয়াঙ্গুনের পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল।
প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও মুসলিম ব্যক্তিত্ব ম্যা আয়ে-র বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে বাঙালি মসজিদের সামনের পরিস্থিতি তখন নিয়ন্ত্রণে ছিল। দেশের অন্যান্য অংশে প্রাণঘাতী অস্থিরতা বিরাজ করলেও, ইয়াঙ্গুনের আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি সবসময়ই শহরটির একটি অনুপ্রেরণাদায়ক বৈশিষ্ট্য হিসেবে টিকে রয়েছে।
গাছের সারির উপর দিয়ে উঁকি দেওয়া মসজিদের ছোট ছোট চূড়াগুলো আজও সেই সহাবস্থান ও ইতিহাসের বার্তা বয়ে চলেছে।
স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
রেঙ্গুনের মুসলমান জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র বাঙালি মসজিদ। বার্মায় যে কয়েকটি স্থাপত্য ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে ভ্রমণকারীদের নিকট পছন্দের শীর্ষে রয়েছে তন্মধ্যে বাঙালি মসজিদ অন্যতম একটি। ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি বিধায় এর স্থাপত্যের মাঝে মুঘল ও ব্রিটিশ তথা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। যে কারণে ধর্মীয় কেন্দ্র ছাড়াও, দেশ বিদেশের ভ্রমণকারীদের জন্য স্থাপত্য হিসেবেও বাঙালি মসজিদ বার্মার অতিপরিচিত একটি জায়গা।

সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটির স্মৃতি
সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি ১৮৫৬ সালে পাকিস্তানের হরিপুর জেলার সিরিকোট নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। বংশগতভাবে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৩৯তম আওলাদ। তাঁর পীর ও মুর্শিদ খাজা আবদুর রহমান চৌহরভীর নির্দেশে তিনি ১৯২০ সালে বার্মায় হিজরত করেন এবং সেখানে তিনি ১৬ বছর অবস্থান করেন। ইসলামের প্রচার-প্রসার ও কাদেরিয়া তরিকার চর্চায় তিনি বার্মার মুসলমানদের মাঝে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন।
বার্মায় যাওয়ার কিছুদিন পর তিনি বাঙালি মসজিদের ইমাম ও খতিব নিযুক্ত হন। ইমাম ও খতিব হিসেবে সেখানকার মুসুল্লিদের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। খতিবের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি কাদেরিয়া তরিকার চর্চায় মনোনিবেশ করেছেন।
তাঁর আকর্ষণীয় নূরানী চেহারা ও শরীয়ত তরীকত হাকীকত মারেফত প্রভৃতি বিষয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞান লক্ষ্য করে মুসল্লীরা ক্রমশ তাঁর সান্নিধ্যে আসা শুরু করলো। স্থানীয় মুসল্লীরা তাঁকে বাইয়াত করানোর জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করলে তিনি তাঁর মুর্শিদের নিকট এর সমাধান চাইলেন। হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী তাঁর নিকট একটি রুমাল পাঠান। কিছুকাল পর তাঁকে খেলাফত ও ইজাজত দিয়ে বাইয়াত করানোর অনুমতি প্রদান করা হয়।

খেলাফত প্রাপ্তির পর তিনি মুরিদ করানো শুরু করলেন। দলে দলে নবী অলি প্রেমিকরা বাইয়াত হতে থাকল। এ সময় চট্টগ্রামের বহু লোক জীবিকার সন্ধানে রেঙ্গুন তথা সমগ্র বার্মায় অবস্থান করছিল। দৈনিক আজাদী ও কোহিনূর ইলেক্ট্রিক প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক, সুফী আবদুল গফুর, ডা. মোজাফফরুল ইসলাম, আবদুল মজিদ সওদাগর, মাস্টার আবদুল জলিলসহ বেশ কিছু চট্টগ্রামের লোক রেঙ্গুনেই বাঙালি মসজিদের দায়িত্বশীল থাকা অবস্থায় তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন।
হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী একটি অলৌকিক অদ্বিতীয় ৩০ পারা দুরূদ শরীফ সম্বলিত ‘মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসূল’ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) রচনা করেন। এই অদ্বিতীয় কিতাবখানা ছাপিয়ে প্রচার করার জন্য এবং দারুল উলুম ইসলামিয়া রহমানিয়া মাদ্রাসার উন্নতিকল্পে অর্থ সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন। তিনি আরো বললেন, “যতদিন এ কাজ সম্পূর্ণ না হয় ততদিন রেঙ্গুন ত্যাগ করে কোথাও যাবে না”। আপন পীরের নির্দেশ শিরোধার্য এ কথা অনুধাবন ও বিশ্বাস করতেন বলে সৈয়দ আহমদ শাহ দীর্ঘ ১৬ বছর দেশে যাননি। যতদিন পর্যন্ত তিনি রেঙ্গুনে ছিলেন ততদিন যথাসম্ভব তিনি বাঙালি মসজিদের ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।
রেঙ্গুন অবস্থানকালে বাঙালি মসজিদে তিনি প্রত্যেকদিন আসরের নামাজের পর ধর্মীয় বিষয়াদি, মাসয়ালা নিয়ে মুসল্লিদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। সেখানে উপস্থিত মুসল্লীদের জন্য তিনি প্রতিদিন একপোয়া (২৫০ গ্রাম) ওজনের খাবার সংকুলান হয়, এমন পাত্রে হালুয়া রান্না করতেন এবং নিজ হাতে সকলের মাঝে পরিবেশন করতেন। কখনো কখনো ৪০ থেকে ৫০ জনও মজলিশে উপস্থিত থাকতেন। তবে সবাই সমানভাবে খাবার গ্রহণ করতেন।
উক্ত মসজিদেই তাঁর একটি কারামতের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তৎকালীন মুয়াজ্জিন। মুয়াজ্জিন বলেন, একদা আমি মাগরিবের সময় মসজিদ পরিষ্কার করে সংলগ্ন হাউযে গেলাম, তখন দেখি তিনি সেখানে অজু করছেন। আবার একই সময় মসজিদের দোতলায় গিয়ে দেখি তিনি সেখানে মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে নসিহত পেশ করছেন।
সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটীর এমন অনেক স্মৃতি বিজড়িত স্থান রেঙ্গুনের বাঙালি মসজিদ। অন্তত ৩টি কারণে তাঁর জীবন ও দরবারে সিরিকোটের ভক্ত, মুরিদের নিকট এই মসজিদের বিশেষ স্থান রয়েছে:
১. এই মসজিদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি জনমানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মেশার সুযোগ পেয়েছেন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পীরের কাছ থেকে কাদেরিয়া তরিকার খেলাফত লাভ করেছেন।
২. এই মসজিদের দায়িত্বশীল থাকা অবস্থায় তিনি স্বীয় মুর্শিদ খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রচিত ৩০ পারা দুরূদ শরীফ সম্বলিত ‘মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসূল’ ছাপিয়ে প্রকাশ করেছেন।
৩. এই মসজিদের খতিব থাকাবস্থায় তিনি চট্টগ্রামের কিছু মানুষকে মুরিদ করিয়েছিলেন এবং এই সূত্রে চট্টগ্রামে আগমন করে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটীর সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার লক্ষ লক্ষ ভক্ত মুরিদ উপমহাদেশে রয়েছে। বাংলাদেশে রয়েছে এই দরবারের অত্যন্ত মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। উক্ত দরবারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আয়োজন জশনে জুলুস ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপিত হয়।
বলাবাহুল্য, দেশ-বিদেশে সিরিকোট দরবার শরীফের যত ভক্ত, মুরিদ রয়েছে সকলের কাছেই সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটির স্মৃতি বিজড়িত রেঙ্গুনের বাঙালি মসজিদ ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক আবেগের বিশেষ স্থান।