সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শতবর্ষী ঐতিহ্য: যেখানে রাজপুতদের হাত ধরে ওড়ে সুফি সাধকের পতাকা

 

বর্তমান পৃথিবীতে যখন ধর্মীয় মেরুকরণ ও জাতিগত বিভেদ প্রায়শই সমাজকে গ্রাস করতে চায়, তখন ইন্ডিয়ার নাগপুরের ঐতিহাসিক তাজবাগ প্রাঙ্গণ যেন এক টুকরো শান্তিময় মরূদ্যান। সুফি সাধক হযরত বাবা তাজউদ্দীনের বার্ষিক উরস উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর সেখানে যে অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়, তা বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য এবং চিরঞ্জীব দলিল। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডি নেই; বরং শতাব্দীকাল ধরে হিন্দু-মুসলিমসহ সর্বধর্মের মানুষের যৌথ অংশীদারিত্বে অনুষ্ঠিত হয় মানবতার এক মিলনমেলা।

তাজবাগের এই সুফি উৎসবের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর উদ্বোধনী আচারের মধ্যে। দরগাহ শরিফের প্রধান ও পবিত্রতম রীতিনীতি হলো ‘রশমে পরচম কুশাই’ বা পবিত্র সবুজ পতাকা উত্তোলন। শত বছরের প্রাচীন প্রথা ও ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে এই পবিত্র পতাকা কোনো মুসলিম আলেম উত্তোলন করেন না; বরং নাগপুরের ঐতিহ্যবাহী হিন্দু ভোঁসলে রাজপরিবারের একজন বংশধর এটি সম্পন্ন করেন। এবারও ভোঁসলে রাজপরিবারের উত্তরসূরি শ্রীমন্ত পঞ্চম রাজে রঘুজি ভোঁসলের হাত ধরে যখন দরগাহর আকাশে ইসলামের ঐতিহ্যবাহী সবুজ পতাকাটি উড়েছিল, তখন সেখানে উপস্থিত লাখো মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল পরম সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বাণী।

 

অন্তরের আন্তরিকতাই মূল: বাবা তাজউদ্দীনের শাশ্বত দর্শন
হযরত বাবা তাজউদ্দীন জীবদ্দশাতেই সর্বজনীন মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। নাগপুরের তৎকালীন হিন্দু রাজা রাঘোজি রাও ভোঁসলের পরিবারকে এক কঠিন চিকিৎসা-সংকট থেকে মুক্ত করার পর থেকে এই রাজপরিবারের সাথে তাঁর এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাজার আমন্ত্রণে তিনি ১৯০৮ সাল থেকে আমৃত্যু রাজপ্রাসাদেই অবস্থান করেছিলেন।

সুফি দর্শনের এই মহান সাধক কখনই কাউকে নিজের ধর্ম পরিবর্তন করার কথা বলতেন না। তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকার এবং মুসলমানদের নিয়মিত নামাজ আদায় করার পরামর্শ দিতেন। তাঁর মূল দর্শনই ছিল—বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে স্রষ্টার উপাসনার ক্ষেত্রে অন্তরের সততা, ভক্তি ও আন্তরিকতাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সেই সম্প্রীতির শিক্ষাকে ধারণ করেই দরগাহ শরিফের বর্তমান পরিচালনাকারী ‘তাজউদ্দীন বাবা ট্রাস্ট’-এর নেতৃত্ব গঠিত হয়েছে। এই ট্রাস্টের শীর্ষ নেতৃত্বে মুসলিম ও হিন্দু—উভয় সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। ট্রাস্টের চেয়ারম্যান পেয়ারে খান এবং সেক্রেটারি তাজ আহমদ রাজার পাশাপাশি এখানে সহ-সভাপতি হিসেবে ড. সুরেন্দ্র জিচকার এবং ট্রাস্টী হিসেবে গজেন্দ্রপাল সিং হোলিয়া দায়িত্ব পালন করছেন, যা ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল প্রাতিষ্ঠানিক উদাহরণ।
উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ‘শাহী সন্দল’ শোভাযাত্রায় চন্দন কাঠের পেস্ট ও সুগন্ধিযুক্ত পবিত্র চাদর নিয়ে নাগপুর শহরের হিন্দু ও মুসলিম অধিবাসীরা একসাথে রাজপথে নামেন। এছাড়া দরগাহর সর্বজনীন লঙ্গরখানায় আসা লাখ লাখ পুণ্যার্থীকে কোনো প্রকার জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা সামাজিক বৈষম্য ছাড়াই পাশাপাশি বসিয়ে তাবাররুক খাওয়ানো হয়। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান ও পার্সি সম্প্রদায়ের মানুষের এই যৌথ অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, তাজবাগের মাটিতে আধ্যাত্মিকতা কোনো বিভেদ তৈরি করে না, বরং মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত