শাহ আলীর মাজারে হামলা: রাজনৈতিক দল হিসেবে সর্বোচ্চ সোচ্চার এনসিপি; সাড়াশব্দ নেই ক্ষমতাসীন বিএনপির

রাজধানীর মিরপুরে পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.)-এর মাজারে ন্যাক্কারজনক হামলার পর তিন দিন পার হলেও ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া বা শক্ত অবস্থান দেখা যায়নি। দলটির এই রহস্যজনক নীরবতা সুফি সমাজকে ক্ষুব্ধ ও আশাহত করলেও, প্রথম থেকেই রাজপথে ও তীব্র রাজনৈতিক ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে সর্বোচ্চ সোচ্চার অবস্থান নিয়েছে উদীয়মান রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সশরীরে মাজার প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করে সাধারণ ভক্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে দলের প্রধান ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম এবং যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করে একে বাংলাদেশের সুফি সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন।

প্রতিবাদ জানাতে এনসিপি প্রতিনিধি দলের মাজার পরিদর্শন
বর্বরোচিত এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাতে এবং সাধারণ ভক্তবৃন্দের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে হযরত শাহ আলী বোগদাদীর মাজার শরিফ পরিদর্শন করে এনসিপির একটি প্রতিনিধি দল। পরিদর্শনে নেতৃত্ব দেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। এ সময় তাঁর সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির ধর্ম ও সম্প্রীতি সেলের সম্পাদক তারেকুল ইসলাম, এডভোকেট হুমায়রা নূর, যুগ্ম সদস্য-সচিব ফরিদুল হক, শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম, যুগ্ম সদস্য-সচিব প্রীতম দাশ, নেত্রকোনা জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য-সচিব ফাহিম রহমান খান পাঠান এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কসহ দলের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

ষড়যন্ত্র ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির তোপ
মাজার পরিদর্শনকালে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, “এই ন্যাক্কারজনক হামলার প্রতিবাদ জানাতে এবং মাজারের ভক্তবৃন্দের পক্ষে দাঁড়াতে আমরা এখানে এসেছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল থেকে আমরা লক্ষ্য করছি যে, দেশি-বিদেশি নানা কুচক্রী মহল বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে মাজারে হামলা শুরু করেছে। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, অতীতে ঘটে যাওয়া এই হামলাগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট বিচার বা দৃশ্যমান শাস্তি হয়নি। আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাতেই ঢাকার অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্র শাহ আলীর মাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে এমন বর্বরোচিত হামলা চালানোর দুঃসাহস পেয়েছে উগ্রবাদীরা।”

সংসদে ও মাঠে এনসিপির সুর চড়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক এবং ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম সরাসরি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সংসদে ও গণমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন: “মিরপুরে শাহ আলীর মাজারে হামলা করা হয়েছে, এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য কোথায়? আপনারা (বিএনপি) নির্বাচনের আগে ও পরে বারবার বলেছেন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মাজারে হামলা হয়েছে; কিন্তু এখন তো আপনাদের সময়, আপনাদের সরকারের সময়ে কেন বারবার মাজারে হামলা হচ্ছে?”

এর আগে সংসদের প্রথম অধিবেশনের শেষদিনেও জনাব নাহিদ ইসলাম মাজার হামলার বিচার চেয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন, যা দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নাহিদ ইসলামের এই প্রশ্ন ক্ষমতাসীন দলের মাজার ও ধর্মীয় সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিকে বড় ধরনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

‘আমাদের কলিজা ধরে টান দিলে আমরাও টান দিবো’: সারোয়ার তুষার
হামলার তীব্রতা ও সুফি জনতার আবেগকে ধারণ করে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার সামাজিক অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। সুফি ঘরানার মানুষের ওপর এই আঘাতকে তিনি অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে উল্লেখ করে বলেন: “শাহ আলীর মাজারে হামলা মানে আমাদের কলিজার উপর হামলা। যারা আমাদের কলিজা ধরে টান দিতে চায়, আমরাও তাদের কলিজা ধরে টান দিবো।”
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ভবিষ্যতে আবারো কোনো মাজারে বা ভক্তদের ওপর হামলা চালানো হলে সাধারণ ভক্তবৃন্দ নিজেদের সুরক্ষায় শক্তভাবে তা প্রতিরোধ করবে। আর এই প্রতিরোধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যদি মাজারের শান্তিপ্রিয় ভক্তদের ওপর সরকার কোনোভাবে জুলুম বা নিপীড়ন চালানোর চেষ্টা করে, তবে এনসিপি সব সময় মাজারের ভক্তবৃন্দের পক্ষেই শক্ত অবস্থান নিবে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তোপ
হামলা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং ঘটনাটিকে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ হিসেবে চালানোর পুলিশি চেষ্টার কড়া সমালোচনা করেন সারোয়ার তুষার। তিনি বলেন, “পত্র-পত্রিকায় পুলিশের যে বক্তব্য আমরা দেখেছি তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। তারা এই হামলাকে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’-এর অংশ বলে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে। আমাদের স্পষ্ট প্রশ্ন—যদি মাদকবিরোধী অভিযান চালাতেই হয়, তবে তার জন্য পুলিশ ও প্রশাসন আছে। পুলিশ প্রশাসনের বাইরে তারা কারা, যারা এখানে এসে সাধারণ ভক্তবৃন্দের ওপর হামলা করল এবং মা-বোনদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করল? প্রশাসনের এমন অসংলগ্ন বক্তব্য ও আচরণ থেকেই স্পষ্ট যে, পুলিশ প্রকারান্তরে এই হামলাকে প্রশ্রয় দিয়েছে।”

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “যাদের ভোটে বাংলাদেশে সরকার প্রতিষ্ঠা হয়, সংসদ গঠন হয়, তাদেরকে যদি নিরাপত্তা দিতে না পারেন তাহলে আপনি পৃথিবীর যত বড় সংবিধান বিশেষজ্ঞই হন না কেন, আমাদের কিছু যায় আসে না। আপনি ইন্টেরিমের (অন্তর্বর্তীকালীন) স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার চেয়েও অথর্ব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।”

স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি
জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে মাজার সুরক্ষায় ও হামলা বন্ধে সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়ে বলা হয়, গত দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাজারে যতগুলো হামলার ঘটনা ঘটেছে, তার প্রত্যেকটির সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে, এই দীর্ঘ সময়ে মাজারগুলোর ওপর হওয়া ধারাবাহিক হামলাগুলোর নেপথ্যে কারা দায়ী এবং কী উদ্দেশ্যে এই ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে, তা নিরপেক্ষভাবে খুঁজে বের করতে একটি ‘স্বাধীন তদন্ত কমিশন’ গঠন করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে এনসিপি।

ক্ষমতাসীন বিএনপির নীরবতা ও রাজনৈতিক সমীকরণ
অন্যদিকে, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির পক্ষ থেকে এই হামলার বিরুদ্ধে কোনো বিবৃতি বা স্থানীয় পর্যায়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে না তোলায় সুফি সমাজের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তরিকতপন্থী ও মাজার সংশ্লিষ্ট ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছে, রাজনৈতিক ভোটব্যাংক বা কৌশলগত কারণে উগ্রপন্থী দলগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিদের সাথে দূরত্ব তৈরি করতে না চাওয়ার মনস্তত্ত্ব থেকেই বিএনপি এই ন্যাক্কারজনক মাজার হামলার ঘটনায় ‘সাড়াশব্দহীন’ নীতি অবলম্বন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই নির্লিপ্ততা এবং উগ্রবাদ প্রতিরোধে দৃশ্যমান গাফিলতির কারণে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর এই সাহসী অবস্থান দেশের বৃহৎ সুফিপন্থি ভোটারদের মাঝে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত