১৪৪৮ হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে মিশরের রাজধানী কায়রোর ঐতিহাসিক আল-আযহার মসজিদে এক বর্ণাঢ্য ও বৃহৎ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আল-আযহার শরিফ। গত ১৬ জুন, মঙ্গলবার আয়োজিত এই মহতী অনুষ্ঠানে আল-আযহারের উপপ্রধান শায়খ আইমান আবদুল গনি, মিশরের আওকাফ (ধর্মবিষয়ক) মন্ত্রী অধ্যাপক ড. উসামা আল-আযহারি, প্রজাতন্ত্রের গ্র্যান্ড মুফতি অধ্যাপক ড. নাজির আইয়াদ এবং আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. সালামা দাউদসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামা, গবেষক ও সুফি নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী গবেষণা একাডেমির মহাসচিব ড. মুহাম্মাদ আল-জিন্দি, আল-আযহার ইনস্টিটিউটস সেক্টরের প্রধান অধ্যাপক ড. আহমাদ আশ-শারকাওয়ি, সিনিয়র উলামা বোর্ডের সদস্য ও সাবেক আল-আযহার উপপ্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ আদ-দুওয়াইনি, সুফি তরিকার প্রধান ড. আবদুল হাদি আল-কাসাবি, আশরাফ পরিষদের প্রধান মাহমুদ আশ-শরীফ, আল-আযহার মসজিদের রিওয়াকের বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের তত্ত্বাবধায়ক ড. আবদুল মুনইম ফুয়াদ এবং আল-আযহার মসজিদের মহাপরিচালক ড. হানি আওদাহসহ আল-আযহার শরিফের বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বরেণ্য আলেম।
অনুষ্ঠানে হিজরতের তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. সালামা দাউদ বলেন, “মহানবীর হিজরত কেবল ইতিহাসের ধুলোয় ধূসরিত কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এটি এমন এক স্থায়ী ঈমানি ও শিক্ষামূলক চিরন্তন আদর্শ, যা থেকে প্রতিটি প্রজন্ম আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস এবং সঠিক তাওয়াক্কুলের অবিরাম শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।”
ড. সালামা আরও বলেন, হিজরতের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো সংকটের মুহূর্তে আল্লাহর প্রতি অটল আস্থা রাখা। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন সওর গুহায় আত্মগোপনকালীন সময়ে হযরত আবু বকর সিদ্দীককে উদ্দেশ করে প্রিয় নবীর সেই ঐতিহাসিক উক্তি— “দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন”। তিনি জোর দিয়ে বলেন, হিজরত ইসলামী ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা, যার মাধ্যমে ঈমান, কর্ম এবং ত্যাগের সুদৃঢ় ভিত্তিতে একটি আদর্শ রাষ্ট্র ও সুশৃঙ্খল সমাজ নির্মাণের ভিত স্থাপিত হয়েছিল। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি গঠন, চরিত্র সংশোধন, দেশসেবা এবং সমাজ উন্নয়নে হিজরতের রূপরেখা অনুসরণ করা একান্ত জরুরি।
অপরদিকে, হিজরতের আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক ব্যাখ্যা প্রদান করতে গিয়ে ইসলামী গবেষণা একাডেমির বিশিষ্ট সদস্য ড. আবদুল ফাত্তাহ আল-আওয়ারি বলেন, “ইসলামে হিজরত মানে শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভৌগোলিক স্থানান্তর বা দেশত্যাগ নয়; বরং এর প্রকৃত ও গভীর তাৎপর্য হলো গুনাহ, অবাধ্যতা এবং আল্লাহ তাআলা যা কিছু নিষিদ্ধ করেছেন—সেই সমস্ত পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে আনা।” তিনি হিজরতের আত্মিক দিক বিশ্লেষণ করে আরও বলেন, প্রকৃত হিজরত হলো মূলত আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে আনুগত্যের দিকে, গাফেলতি থেকে সচেতনতার দিকে, মন্দ থেকে কল্যাণের দিকে, স্বার্থপরতা থেকে পরোপকারিতার দিকে এবং সব ধরনের জুলুম থেকে পরম ন্যায়বিচারের পথে অগ্রসর হওয়ার নাম। এটি মুমিনের জীবনের এমন এক চলমান ঈমানি ও আধ্যাত্মিক সফর, যার মাধ্যমে একজন মানুষ প্রতিনিয়ত আত্মশুদ্ধি, চরিত্র সংশোধন এবং আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেকে নতুনভাবে নবায়ন করে তোলে।

হিজরি নববর্ষের এই মহিমান্বিত অনুষ্ঠানের শেষভাগে উপস্থিত শ্রোতাদের মুগ্ধ করে চমৎকার এক ধর্মীয় কাসিদা ও না’ত আবৃত্তি করা হয়। সবশেষে এক আবেগঘন বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। মোনাজাতে নতুন হিজরি বছর ১৪৪৮-কে মিশর, সমগ্র আরব বিশ্ব এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য মহাকল্যাণ, অফুরন্ত বরকত, শান্তি, নিরাপত্তা, পারস্পরিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই অগ্রগতির বছর হিসেবে কবুল করার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে আকুল প্রার্থনা জানানো হয়।