(কাশ্মীরের মিয়া নিজামুদ্দীনের দরগাহে ওরস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ওয়েবসাইটে ২০২৪ সালের ১৩ জুন একটি ফিচার প্রকাশিত হয়। প্রাসঙ্গিক বিধায় দ্য সুফি টাইমসের পাঠকদের জন্য ফিচারটি বাংলায় অনুবাদ করা হলো।)
ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের শ্রীনগরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বাবা নগরী এলাকার পার্বত্য বনাঞ্চলের সুফি দরবার অভিমুখে যাওয়ার রাস্তাটি গত সপ্তাহে (২০২৪ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ) রূপ নিয়েছিল এক বর্ণিল উৎসবে। কাশ্মীরের যাযাবর গুজ্জর সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মুসলিম সাধক হযরত মিয়াঁ নিজামউদ্দিন কিয়ানভী (রহ.)-এর পবিত্র মাজার শরীফে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সমবেত হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক, মেহেদি রাঙানো দাড়ি এবং উজ্জ্বল পাগড়ি পরিহিত লাখো ভক্ত-আশেকানের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পুণ্যভূমি। ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি বহু ভক্তকে দরগাহ প্রাঙ্গণের গাছগুলোতে বহুবর্ণের সুতো বাঁধতে দেখা যায়, যা মূলত তাঁদের বিশেষ মানত ও দোয়া কবুলের প্রতীক।
উনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক এই মাজার শরীফের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে বছরজুড়ে আগত সর্বস্তরের ভক্তদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খাবার (লঙ্গর) পরিবেশন করা হয়। দরবারে সমবেত আশেকানদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই পুণ্যভূমিতে এসে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলে মনের সকল নেক মাকসুদ পূরণ হয়।
হযরত মিয়াঁ নিজামউদ্দিন কিয়ানভী (রহ.) মূলত কাশ্মীরের সন্তান ছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তিনি বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের হাজারা অঞ্চলে হিজরত করেন। সেখানে একজন প্রখ্যাত সুফি সাধকের সান্নিধ্যে থেকে উচ্চতর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও দীক্ষা (খেলাফত) লাভ করার পর তিনি পুনরায় কাশ্মীরে ফিরে আসেন এবং সাধারণ মানুষের মাঝে সুফিদের কর্মপদ্ধতি অনুসারে ইসলামের উদার ও মানবিক বাণী প্রচার শুরু করেন। তাঁর ওফাতের পর, তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ এই মাজার শরীফটি নির্মাণ করা হয়—যা এই অঞ্চলের সাথে সুফিদের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রমাণ।
দরবারে আগত আব্দুল রাজ্জাক নামে এক প্রবীণ ভক্ত তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “আমি যখন ছয় বছরের শিশু, তখন থেকেই এই দরবার শরীফে আসছি। এখানে এসে হাজিরা দিতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে হয়। আমার শৈশবের কথা মনে আছে, তখন আমাদের মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে এখানে আসতে হতো। তবে দিন বদলেছে, আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থার কল্যাণে এখন আমরা মাত্র একদিনের মধ্যেই মাজারে পৌঁছে যেতে পারি।”
মোহাম্মদ ফারুক নামে অন্য এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভক্ত বলেন, “আমি যদি এই পবিত্র পরিবেশ নিজের চোখে দেখতে পারতাম, তবে খুব ভালো লাগত। কিন্তু চোখে দেখতে না পেলেও, এই দরবার শরীফে আসলে আমি এক পরম আত্মিক ও মানসিক শান্তি খুঁজে পাই।”
উল্লেখ্য, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত এবং উভয় দেশের দ্বারা সম্পূর্ণ নিজস্ব দাবিদার কাশ্মীর মূলত একটি মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল। ১৯৮৯ সাল থেকে এই বিতর্কিত ভূখণ্ডে কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম চলমান রয়েছে, যা এই অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মুসলমানের দ্বারা সমর্থিত।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলে আসা এই ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মাঝে কাশ্মীরের উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শত শত মাজার ও খানকাহগুলো সাধারণ মানুষের কাছে কেবল ধর্মীয় স্থান নয়, তারচেয়েও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ কিছু। কাশ্মীরের সাধারণ জনতা ও ভক্তদের কাছে এই পবিত্র দরগাহগুলো হলো এমন এক দুর্লভ ও শান্তিময় আশ্রয়স্থল, যা তাঁদেরকে এই অঞ্চলের চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা ও মানসিক ক্লান্তি থেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখে এক অপার্থিব প্রশান্তি দান করে।














