শাইখুল আযহার, ইমাম আকবর ড. আহমদ আত-তায়্যিব বলেছেন, মানবাধিকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী এমন একটি ঐকমত্য প্রয়োজন, যা সব দেশের সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক বাস্তবতাকে সম্মান করবে। তিনি মনে করেন, মানবাধিকার কখনোই অন্য জাতি বা সমাজের ওপর নির্দিষ্ট চিন্তা বা জীবনধারা চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যম হওয়া উচিত নয়।
মঙ্গলবার আল-আযহারে মানবাধিকারবিষয়ক ফরাসি রাষ্ট্রদূত ইসাবেল রোমের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে মানবাধিকার, স্বাধীনতা, পূর্ব ও পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়।
শাইখুল আযহার বলেন, পূর্ব ও পশ্চিমের মানবাধিকার সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাই এমন একটি মানবাধিকার ধারণা গড়ে তুলতে হবে, যা সব সভ্যতা ও সংস্কৃতির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। অন্যথায় মানবাধিকারের নামে বিভিন্ন সমাজের বিশ্বাস, রীতি-নীতি ও মূল্যবোধে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে বিশ্বে যুদ্ধ ও সংঘাত কমে আসবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এখনো মানুষ তার মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে। প্রযুক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি সমতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধেরও সুরক্ষা প্রয়োজন।
গাজায় চলমান পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে শাইখুল আযহার বলেন, ধর্ম নিজে কখনো সংঘাতের কারণ নয়। বরং ধর্মের অপব্যবহার করে যুদ্ধ, সহিংসতা ও অধিকার লঙ্ঘনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তিনি যুদ্ধ বন্ধ করা, নিরীহ মানুষের জীবন ও ভূমি রক্ষা করা এবং মানবাধিকারের নামে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বন্ধ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই চিন্তা থেকেই ২০১৯ সালে আল-আযহার ও ভ্যাটিকানের উদ্যোগে মানবিক ভ্রাতৃত্বের ঐতিহাসিক দলিল স্বাক্ষরিত হয়।
শাইখুল আযহার আরও বলেন, মানবাধিকারের ভিত্তি হওয়া উচিত মানুষের জীবন, সম্পদ, মর্যাদা ও পারিবারিক অধিকার রক্ষার মতো নৈতিক মূল্যবোধ। এগুলো রক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ সময় তিনি ‘ইজিপশিয়ান ফ্যামিলি হাউস’-এর অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। আল-আযহার ও মিশরের চার্চ নেতাদের যৌথ এই উদ্যোগটি দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে ফরাসি রাষ্ট্রদূত ইসাবেল রোম শাইখুল আযহারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মানবাধিকার মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, বরং ঐক্য সৃষ্টি করার মাধ্যম হওয়া উচিত।
তিনি জানান, ১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা গ্রহণ করা হয়েছিল, যাতে বিশ্বে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যায়।
ফরাসি রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান দেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি আল-আযহারের সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করেন এবং এগুলোকে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অনুকরণীয় বলে উল্লেখ করেন।