আজ ২০ বৈশাখ, দক্ষিণ চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিক জ্যোতিষ্ক, আমির ভাণ্ডার দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা সৈয়দ আমিরুজ্জামান শাহ্ (রহ.)-এর পবিত্র উরস শরিফ। ১৮৪৫ সালের ১৫ মার্চ (১ চৈত্র ১২৫২ বঙ্গাব্দ) চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার হাইদগাঁও গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত সুফি পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা সৈয়দ মওলা চাঁন্দ ও মাতা হালিমা খাতুনের এই সুযোগ্য সন্তান বংশপরম্পরায় ছিলেন ইসলামের মহীয়সী নারী হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর।
শিক্ষা ও জ্ঞান অন্বেষণ:
শৈশবে নিজ পরিবারে শিক্ষার হাতেখড়ি হওয়ার পর মাওলানা সৈয়দ শরফুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে কিছুটা বিচলিত হলেও মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি উচ্চশিক্ষা ও ইলমে তাসাউফ অর্জনে ব্রতী হন। তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত আলেম মাওলানা সৈয়দ শাহ্ আবদুর রশিদ, মাওলানা আবদুল আজিজ কদলপুরি এবং সুফি সাধক মাওলানা আজগর শাহ ও হযরত আকবর শাহের নিকট আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পাঠ গ্রহণ করেন।
মাইজভাণ্ডারী দর্শনে অবগাহন:
সৈয়দ আমিরুজ্জামান শাহ্ (রহ.)-এর জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি মাইজভাণ্ডারী তরীকার প্রবর্তক গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর সান্নিধ্য লাভ করেন। লোকশ্রুতি আছে, এক অলৌকিক ইশারায় তিনি মাইজভাণ্ডার দরবারে উপস্থিত হন এবং প্রথম দেখাতেই গাউসুল আযম তাঁকে পরম স্নেহে কাছে টেনে নেন। দীর্ঘ এক যুগ মুর্শিদের খেদমতে আত্মনিয়োগ করে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি বেলায়েতের প্রকাশ্য খেলাফত লাভ করেন।
আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও প্রচার:
খেলাফত লাভের পর নিজ গ্রামে ফিরে তিনি মাইজভাণ্ডারী দর্শনের প্রচার ও প্রসারে অনন্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাবে দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষ সুফিবাদের দীক্ষা গ্রহণ করেন। পীর-মুর্শিদের প্রতি তাঁর ভক্তি ও আদব ছিল প্রবাদপ্রতিম; বলা হয়, তিনি দরবার শরিফ থেকে ফেরার সময় সম্মানে কখনো দরবারের দিকে পিঠ দিতেন না, বরং পিছনে হেঁটে বাড়ি ফিরতেন।
সাহিত্য ও মরমী দর্শন:
আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন শক্তিমান মরমী কবি ও গীতিকার। তাঁর রচিত বাংলা ও উর্দু কালামসমূহ আজও ভক্ত-আশেকানদের হৃদয়ে আধ্যাত্মিক খোরাক যোগায়। তাঁর দর্শনে ‘আমি’ ও ‘তুমি’র ভেদাভেদ ঘুচিয়ে এক মহাসত্যের মিলনের কথা ফুটে উঠেছে। ইমামে আহলে সুন্নাত মাওলানা সৈয়দ আজিজুল হক শেরে বাংলা (রহ.) তাঁর ‘দিওয়ানে আজিজ’ গ্রন্থে আমিরুজ্জামান শাহ্ (রহ.)-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
ওফাত ও উত্তরসূরি:
১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ মে (২০ বৈশাখ) এই মহান সুফি সাধক নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আমির ভাণ্ডার দরবার শরিফ আজও শান্তি ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। প্রতি বছর ২০ বৈশাখ ছাড়াও ১ মাঘ ও ১ আশ্বিন এই দরবারে বিশেষ উরস মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজারো মানুষের মিলনমেলা ঘটে।
সৈয়দ আমিরুজ্জামান শাহ্ (রহ.)-এর জীবন ছিল একাধারে কঠোর ত্যাগ, অদম্য সাধনা এবং আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত। তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা ও সুফি দর্শন আজও ভক্তদের মনে সোনালী অতীতের অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।