হযরত শাহজালালের দরগাহে লঙ্গরখানায় ব্যবহৃত ঐতিহাসিক তামার পাতিলের ইতিহাস

 

স্বাভাবিকভাবেই যে কোনো দরগাহ, দরবারের ন্যায় হযরত শাহজালালের মাজারেও রয়েছে লঙ্গরখানা। যা মাজারে আগত ভক্তবৃন্দের দান, সদকা, নজর নেয়াজ, মান্নতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে মাজারে থাকা গরিব মিসকিন, অসহায়, পাগল ফকিরদের খাবারের ব্যবস্থা হয়। অনেকে লঙ্গরখানার খাবারকে তাবারুক হিসেবে বরকতের নিয়তে গ্রহণ করে থাকেন।

হযরত শাহজালালের মাজার সংলগ্ন লঙ্গরখানায় রয়েছে বিশাল আকৃতির তামার ডেগ বা পাতিল। তামা দিয়ে তৈরি ও অস্বাভাবিক আকৃতির বিধায় ভক্তবৃন্দরা এই পাতিলগুলোকে বিশেষ নজরে দেখেন। অনেকে পাতিলে নিজেদের দান, সদকা, নজর নেয়াজের টাকা-পয়সাও ফেলেন।

 

বিশাল আকৃতির এই তামার পাতিলগুলোর ইতিহাস কী?

হযরত শাহজালাল ও দরগাহ নিয়ে রচিত প্রামাণ্য গ্রন্থ থেকে এই বিশেষ পাতিলগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়।

ঢাকার হোসেনী দালানের নির্মাতা মীর মুরাদ বক্স ছিলেন মুঘলদের মীর বহর-ই-ন‌ওয়ারা অর্থাৎ নৌ-সেনাপতি। তিনি ঢাকার অন্যতম বিখ্যাত সাংস্কৃতিক স্থাপত্য হোসেনী দালান নির্মাণ করেন। ১৬৯৫ সালে তিনি হযরত শাহজালালের মাজারে নজর নেয়াজের উদ্দেশ্যে দক্ষ কারিগর দ্বারা উক্ত তামার পাতিলগুলো তৈরি করেন। অতঃপর তিনি হযরত শাহজালালের দরগাহে এই পাতিলগুলো ভক্তির নিদর্শন স্বরূপ প্রদান করেন।

 

কীভাবে এই বিশাল আকৃতির পাতিলগুলো দরগাহে নিয়ে আসা হলো তা নিয়ে রয়েছে কিংবদন্তি।
তামা দিয়ে তৈরি বিধায় পাতিলগুলো এত ভারী হয়ে গিয়েছিল যে, এগুলো বহন করে ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত নিয়ে আসার মতো যানবাহন ছিল না। তখন তিনি ভাবলেন, যেহেতু এগুলো হযরত শাহজালালের মাজারে দেয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে সেহেতু যদি হযরত শাহজালাল এগুলো কবুল করে থাকেন তাহলে আপনা আপনি এগুলো তাঁর দরগাহে পৌঁছে যাবে। এই ভেবে তিনি পাতিলে নাম ধাম লিখে বুড়িগঙ্গায় ছেড়ে দিলেন। পাতিল দুটি নদীপথে ভাসতে ভাসতে সিলেটের চাঁদনী ঘাটে এসে থামলো। পাতিলে লেখা নাম ধাম দেখে সবাই কোথা থেকে এসেছে এবং কী উদ্দেশ্যে এসেছে সব‌ই বুঝতে পারলো। অতঃপর দরগাহের তৎকালীন খাদেম মৌলভী আবদুল আয়াস মুহাম্মদ আহাম্মদকে খবর দেয়া হলো। তিনি এসে সবাইকে সাথে নিয়ে পাতিলগুলো তুলে দরগাহ শরীফে নিয়ে আসলেন।

পাতিলের গায়ে ফারসি ভাষায় কিছু কথা লেখা আছে, যেখানে পাতিলের নির্মাণ সাল, যার পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে তার নাম, উদ্দেশ্য ও পরিমাপের সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। ফারসি ভাষায় লিখিত উক্ত লেখার বাংলা অনুবাদ:

“হিজরী ১১০৬ সালের ১২ই রমযান জাহাঙ্গীর নগরের অধিবাসী ইয়ার মুহাম্মদের পুত্র মুহাম্মদ জাফর তদীয় পুত্র আবু সাঈদ কর্তৃক নির্মিত হয়ে মোরাদ বখশ কর্তৃক অত্র ডেকচি হযরত শাহজালালের দরগায় প্রেরিত হলো। এই পাতিল যেন কখনও দরগার বাইরে নেয়া না হয়। এর ওজন পাঁচ মণ তিন সের দুই পোয়া মাত্র।”

উল্লেখ্য যে, এই বিশেষ পাতিলগুলোতে সবসময় রান্না হয় না। কেবল দরগাহ শরীফের বিশেষ দিবসগুলোতেই এই পাতিলগুলো ব্যবহার করা হয়। যেমন: বার্ষিক ওরস শরীফ, লাকড়ি তোড়া উৎসব, শবে বরাত, ঈদে মিলাদুন্নবী ইত্যাদি।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত