পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় কেন্দ্রে আবারও চলল ‘ভাইজান-ম্যাজিক’। নিজের দুর্গ রক্ষা করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকী। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ভাঙড় প্রমাণ করল যে, এই মাটি এখনও নওশাদের গড় এবং সেখানে তৃণমূলের ‘বহিরাগত ফর্মুলা’ অচল। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ঘোষণার আগেই ভাঙড়ে আবির খেলায় মেতে উঠেছেন ‘ভাইজান’ অনুগামীরা।
ভোটের সমীকরণ ও জয়:
সোমবার (৪ মে) সকাল থেকেই শুরু হয় ভোট গণনা। গণনার শুরুতেই তৃণমূল প্রার্থী শওকত মোল্লা কিছুটা আশা জাগালেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙড়ের চিত্রনাট্য আমূল বদলে যেতে থাকে। প্রাথমিক ট্রেন্ডে তৃণমূল প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও রাউন্ড যত গড়িয়েছে, নওশাদ সিদ্দিকীর লিড তত আকাশছোঁয়া হয়েছে। ১২ রাউন্ডের গণনা শেষে আইএসএফ প্রার্থী নওশাদ তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শওকত মোল্লাকে ২৮,৩১৬ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পিছনে ফেলে জয়ের সুনিশ্চিত লক্ষ্যে পৌঁছে যান। এর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নওশাদ ২৬ হাজার ১৫১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন; এবারের ব্যবধান সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
তৃণমূলের ‘বুমেরাং’ কৌশল:
রাজনৈতিক মহলের মতে, ক্যানিং পূর্ব থেকে শওকত মোল্লাকে সরিয়ে এনে ভাঙড়ে দাঁড় করানোর সিদ্ধান্ত তৃণমূলের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের চেনা মাটির বাইরে এসে ভাঙড়ে নওশাদের সুসংগঠিত সাংগঠনিক শক্তির কাছে কার্যত ধরাশায়ী হতে হয়েছে শওকতকে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভাঙড় কেন্দ্রে তৃণমূল লিড নিলেও, বিধানসভা নির্বাচনে নওশাদের এই বিপুল জয় আইএসএফ শিবিরে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। ক্যানিং-এর ফর্মুলা ভাঙড়ে কাজ না করায় তৃণমূল শিবিরের অন্দরেই এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রেকর্ড ভোট ও ঐতিহাসিক নির্বাচন:
উল্লেখ্য, দুই দফায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে রেকর্ড ৯২.৯৩ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা বাংলার সংসদীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এই বিপুল জনসমর্থন নওশাদের পক্ষেই রায় দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পরিচয় ও শিক্ষা:
নওশাদ সিদ্দিকী ১৯৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আলি আকবর সিদ্দিকী ছিলেন ফুরফুরা শরীফের প্রখ্যাত সুফি সাধক ‘ছোট হুজুর’ খ্যাত পীর জুলফিকার আলির পুত্র। সেই সূত্রে তিনি ফুরফুরা শরীফের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুল আলম হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.)-এর চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরসূরি। তাঁর বড় ভাই আব্বাস সিদ্দিকী ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি নওশাদ একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিত্ব। তিনি ২০১৫ সালে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকীর এই জয় কেবল আইএসএফ-এর রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং এটি ভাঙড়ের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।