পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে জশনে জুলুস আয়োজন এখন চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম বড় অনুষঙ্গ। নবীপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আয়োজিত এ জুলুস আজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে চট্টগ্রামে বড় পরিসরে জশনে জুলুসের যে ধারার সূচনা, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস।
চট্টগ্রামে বৃহৎ পরিসরে জশনে জুলুস আয়োজনের ইতিহাস ১৯৭৪ সাল থেকে। পীর আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ.) এর নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণায় এ আয়োজন নতুন মাত্রা লাভ করে। তাঁর প্রধান খলিফা আলহাজ্ব নূর মোহাম্মদ আলকাদেরী (রহ.)-এর নেতৃত্বে ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে পরপর দুই বছর নগরের বলুয়ারদীঘি খানকাহ শরিফ থেকে জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত টানা এক দশক জশনে জুলুসের নেতৃত্ব দেন মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ.)। সুদূর পাকিস্তানের সিরিকোট দরবার শরিফ থেকে চট্টগ্রামে এসে তিনি এ আয়োজনকে সুসংগঠিত ও বৃহৎ পরিসরে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় জশনে জুলুস চট্টগ্রামে একটি সুপরিচিত ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে।
সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ.) এর পর তাঁর আওলাদ ও স্থলাভিষিক্ত সাজ্জাদানশিন আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ দীর্ঘকাল এ জুলুসের নেতৃত্ব দেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে পীরে বাঙাল সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ ও জশনে জুলুসের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
প্রবর্তকের হাত ধরে বিস্তার
চট্টগ্রামের জশনে জুলুসের ইতিহাসে আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ.) এর নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়। তাঁর উদ্যোগ, নির্দেশনা ও নেতৃত্বেই ১৯৭০-এর দশকে এ আয়োজন সাংগঠনিক ভিত্তি লাভ করে এবং পরবর্তী সময়ে তা বৃহত্তর জনসম্পৃক্ততার রূপ নেয়। তাঁর প্রবর্তিত এ ধারাই কয়েক দশক ধরে অনুসরণ করে আসছেন বিভিন্ন সুফিবাদী তরিকা ও সুন্নি দরবারের পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামা ও নবীপ্রেমী মুসল্লিরা।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের জশনে জুলুসের পরিসরও বাড়তে থাকে। একসময় যে আয়োজন নির্দিষ্ট একটি পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল, তা ধীরে ধীরে বৃহৎ গণসমাবেশে পরিণত হয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে জশনে জুলুস আয়োজনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
আয়োজকদের মতে, এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ, তাঁর জন্ম ও আগমনের আনন্দ প্রকাশ এবং তাঁর আদর্শ ও সুন্নাহর প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা।
কুরআন মজিদের সূরা ইউনূসের ৫৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত লাভে আনন্দ প্রকাশ করতে। জশনে জুলুসের সমর্থকেরা মনে করেন, মহানবী (দ.) এর দুনিয়ায় শুভাগমন আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত ও নেয়ামত। তাই তাঁর আগমন উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশকে তারা এ আয়াতের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন।
৫৫ বছরে ঐতিহ্যের বিস্তার
১৯৭৪ সালে সূচনা হওয়া চট্টগ্রামের এ আয়োজন ২০২৬ সালে এসে ৫৫ বছরের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ এ সময়ে জশনে জুলুস কেবল একটি স্থানীয় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপনের অন্যতম দৃশ্যমান ধারায় পরিণত হয়েছে।
এ বছরও পীরে বাঙাল সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ এর নেতৃত্বে ২৬ আগস্ট, বুধবার চট্টগ্রামে ১২ রবিউল আউয়াল জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক আগে শুরু হওয়া সেই আয়োজনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকছে।
চট্টগ্রামের জশনে জুলুসের এ দীর্ঘ ইতিহাস তাই শুধু একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রার ইতিহাস নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নবীপ্রেম, সুফিবাদী সংস্কৃতি, দরবারভিত্তিক ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং কয়েক প্রজন্মের অংশগ্রহণের স্মৃতি। আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ.) এর হাত ধরে যে আয়োজনের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ দেশের নানা প্রান্তের নবীওলীপ্রেমী মানুষের পরিচিত এক ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।