কীভাবে হয়েছে হযরত শাহজালালের ইন্তেকাল?

 

চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা যখন ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আগমন করেন, তখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল সিলেটের মহান সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দর্শন লাভ করা। ইবনে বতুতার বর্ণনায় হযরত শাহজালালের জীবন যেমন ছিল অলৌকিকতায় পূর্ণ, তেমনি তাঁর বিদায়ের মুহূর্তটিও ছিল এক অনন্য আধ্যাত্মিক ঘটনার স্মারক।

ইবনে বতুতার সঙ্গে সাক্ষাৎ:
ইবনে বতুতা যখন হযরত শাহজালালের দরবারে পৌঁছান, তখন এই মহান সাধকের বয়স ছিল প্রায় ১৫০ বছর। বতুতা তাঁর বর্ণনায় লিখেছেন, শাহজালাল (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত দীর্ঘকায় এবং কৃশকায়। তিনি বছরের পর বছর ধারাবাহিকভাবে রোজা রাখতেন এবং নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। ইবনে বতুতা তাঁর দরবারে তিন দিন অবস্থান করেছিলেন এবং বিদায়লগ্নে শাহজালাল (রহ.) তাঁকে একটি বিশেষ ছাগলের চামড়ার তৈরি পোশাক (খিরকা) উপহার দিয়েছিলেন।

ইবনে বতুতার সরাসরি বর্ণনা:
হযরত শাহজালালের ইন্তেকাল সম্পর্কে ইবনে বতুতা তাঁর রেহলাতে লিখেছেন:
“তাঁর কতিপয় শিষ্য আমাকে ব্যক্ত করেছেন যে, ইন্তেকালের মাত্র একদিন পূর্বে তিনি তাঁদের সকলকে কাছে ডাকেন। পরম করুণাময় আল্লাহর প্রতি তাক‌ওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আগামীকালই আমি এই দুনিয়া ত্যাগ করে তোমাদের ছেড়ে চলে যাব; আমি তোমাদের সেই মহান সত্তার চরণে সঁপে দিয়ে গেলাম, যিনি ব্যতিরেকে ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই।’
পরদিন জোহরের নামাজের সময় যখন ঘনিয়ে এলো, জীবনের শেষ সিজদায় অবনত থাকা অবস্থাতেই তিনি আপন প্রভুর সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। অলৌকিক বিষয় হলো, তাঁর ইন্তেকালের পরক্ষণেই তাঁর হুজরাখানার সন্নিকটে একটি পূর্বনির্ধারিত কবরের সন্ধান মেলে, যা আগে থেকেই খনন করা ছিল এবং পাশেই কাফন ও সুগন্ধি রাখা ছিল। অতঃপর রীতি অনুযায়ী শায়খের পবিত্র দেহ ধৌতকরণ শেষে কাফন পরানো হয়। জানাজার নামাজ সমাপ্তির পর তাঁকে সেই বরকতময় স্থানেই সমাহিত করা হয়। পরম করুণাময় আল্লাহ এই মহান আধ্যাত্মিক পুরুষের ওপর অবারিত রহমত বর্ষণ করুন।”

হযরত শাহজালালের ইন্তেকালের খবরে তৎকালীন বাংলায় শোকের ছায়া নেমে আসে। ইবনে বতুতা তাঁর লেখায় অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে উল্লেখ করেছেন যে, শাহজালাল (রহ.) কেবল একজন বিজয়ী বীর বা ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এমন এক আধ্যাত্মিক পুরুষ যার কাছে প্রকৃতি ও প্রাণিকুলও ছিল অনুগত। তাঁর ইন্তেকালের মাধ্যমে বাংলায় সুফি দর্শনের এক সোনালী অধ্যায়ের পূর্ণতা ঘটে।
আজও ইবনে বতুতার সেই বর্ণনাগুলো গবেষকদের কাছে হযরত শাহজালালের জীবন ও তাঁর ইন্তেকালের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত