রমজান মাস শেষে শাওয়ালের প্রথম দিন, ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভাঙতে শুরু করে মুসলমানদের, মুখরিত হতে শুরু করে গ্রাম ও শহরের অলিগলি। নতুন পোশাক পরে ছোটরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে, আর বড়রা ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঈদের নামাজের প্রস্তুতিতে। ঘর থেকে বেরিয়ে পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদ ও ঈদগাহের পথে হাঁটতে থাকেন মুসল্লিরা। চারদিকে তখন ঈদের আনন্দ আর উৎসবের আবহ।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে নেতৃত্ব দিয়েছেন সুফি-সমাজ। সুফি-সমাজের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান দরবার ও দরগাহ। বাংলাদেশে রয়েছে অসংখ্য দরবার শরীফ। এসব দরবার শরীফে অত্যন্ত উৎসবমুখরভাবেই পালিত হয় পবিত্র ঈদের জামাত। বেশিরভাগ দরবারেই রয়েছে ঈদের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট ঈদগাহ।
ফজরের আলো ফোটার সাথে সাথেই দেশের বিভিন্ন দরবার শরীফে ভক্তদের আনাগোনা শুরু হয়। কেউ কেউ আসে দূর-দূরান্ত থেকে, শুধু স্বীয় পীর সাহেবের সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করবেন বলে। দরবারের আঙিনা ধীরে ধীরে ভরে ওঠে বিভিন্ন রঙের পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা মুসল্লিদের পদচারণায়, চোখেমুখে ঈদের আনন্দ আর হৃদয়ে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দেখা যায়।
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন দরবার শরীফে এবারও বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে ঈদের জামাতের। কোথায় কোন পীর সাহেব বা সাহেবজাদা ঈদের নামাজ আদায় করবেন,তা জানতে ভক্তদের আগ্রহও কম নয়। অনেকেই প্রিয় মুরশিদের পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করাকে মনে করেন জীবনের এক বিশেষ প্রাপ্তি।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দরবার শরীফগুলোতে ইতোমধ্যে ঈদের জামাতের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জামাতের কোথাও কোথাও ইমামতি করবেন পীর সাহেব, আবার কোথাও সাহেবজাদার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হবে ঈদের নামাজের জামাত।
পীর সাহেবরা কে কোথায় ঈদের নামাজ পড়বেন?
ফুরফুরা সিলসিলা থেকে আগত বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দরবার বরিশালের পিরোজপুরের ছারছিনা দরবার শরীফ। দরবারের বর্তমান গদিনশীন পীর সাহেব মাওলানা শাহ আবু নছর নেছারুদ্দিন আহমদ হোসাইন ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবেন দরবার সংলগ্ন জামে মসজিদে।
বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডার দরবারে অনুষ্ঠিতব্য ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবেন গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের গদিনশীন সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী এবং গাউছিয়া হক মঞ্জিলের গদিনশীন পীর সাহেব সৈয়দ মুহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালীস্থ আহলা দরবার শরীফের মসজিদে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবেন দরবারের গদিনশীন সৈয়দ আবরার ইবনে সেহাব আল-কাদেরী আল-চিশতী।
রাঙ্গুনিয়ায় দরবারে বেতাগিয়া আস্তানা শরীফে ঈদের নামাজ পড়বেন দরবারের পীর মাওলানা গোলামুর রহমান আশরাফ শাহ।
চট্টগ্রাম শহরের হালিশহর দরবারে ঈদের নামাজে অংশগ্রহণ করবেন সৈয়দ মুহাম্মদ মনিরুল হক।
চাঁদপুরের ইসলামপুর গাছতলা দরবার শরীফের পীর খাজা আরিফুর রহমান তাহেরী ঢাকার কমলাপুর স্টেশন কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ঈদের নামাজে ইমামতি করবেন।
পুরান ঢাকার মশুরিখোলা দরবার শরীফের পীর সাহেব শাহ মুহাম্মদ সাইফুজ্জামান ঈদের নামাজ আদায় করবেন মশুরিখোলা শাহ সাহেব লেনে দরবারস্থ মসজিদে।
ঢাকার ঐতিহাসিক আজিমপুর দায়রা (বড় দায়রা) শরীফে ঈদের নামাজ আদায় করবেন শাহ সুফি সাইয়্যিদ মুহাম্মদ এনাম উল্লাহ জোহায়ের।
কুমিল্লার সোনাকান্দা দরবারের পীর অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান সোনাকান্দা দারুল হুদা বহুমুখী কামিল মাদরাসা ময়দানে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবেন।
মগবাজার হামিদিয়া দরবারে ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করবেন মাওলানা মাহাবুবুল্লাহ আল-কাদেরী।
নারায়ণগঞ্জ বন্দরের আব্বাসীয় মঞ্জিলে ঈদের নামাজ আদায় করবেন জৈনপুর দরবারের পীর সাহেব মাওলানা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী।
মানিকগঞ্জের সিঙাইরে জয়মন্টপ পীরবাড়ি দরবার শরীফে অনুষ্ঠিতব্য ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবেন আবদুল ওয়াহেদ ওয়াকফ স্টেটের সভাপতি আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ ইউনুস।
মৌলভীবাজারের সিরাজনগর দরবার শরীফে ঈদের জামাত পড়বেন আল্লামা সাহেব কেবলা সিরাজনগরী ও সাহেবজাদা মুফতি আল্লামা শেখ শিব্বির আহমদ।
বি-বাড়িয়া ফান্দাউক দরবার শরীফে ঈদের নামাজ পড়বেন পীর আলহাজ মাওলানা মুফতি সৈয়দ সালেহ আহমাদ মামুন আল হোসাইনী।
আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী ঈদের নামাজ আদায় করবেন সিলেটের জাকিগঞ্জে ফুলতলী দরবার শরীফ প্রাঙ্গণে।
ঝালকাঠির নেছারাবাদ দরবারে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবেন পীর সাহেব হযরত মাওলানা মুহম্মদ খলীলুর রহমান নেছারাবাদী।
কুমিল্লার নাঙোলকোটে মৌকারা দরবার শরীফে ঈদের জামাতে অংশ নিবেন পীর হযরত মাওলানা শাহ মুহাম্মদ নেছারউদ্দীন ওয়ালিউল্লাহী।
ফরিদপুরের চন্দ্রপাড়া পাক দরবার শরীফে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবেন
শাহ্ সুফি সৈয়দ কামরুজ্জামান নকশবন্দী মোজাদ্দেদী আল ওয়ায়সি।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বায়তুশ শরফ দরবার শরীফে ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করবেন পীর আল্লামা শায়খ মুহাম্মদ আবদুল হাই নদভী।
চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী আল-আমিন বারীয়া দরবার শরীফে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবেন আলহাজ্ব সৈয়দ মুহাম্মদ বদরুদ্দোজা বারী, শাহজাদা সৈয়দ মোকাররম বারী।
কুমিল্লার মুরাদনগরের ঐতিহ্যবাহী কামাল্লা দরবার শরীফে অনুষ্ঠিতব্য ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবেন পীর সাইফুর রহমান খন্দকার।
সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এনায়েতপুর পাক দরবারে অনুষ্ঠিতব্য ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করবেন দরবারের বর্তমান সাজ্জাদানশীন শাহ্ সূফী হযরত খাজা মুহাম্মদ গোলাম মেহেদী।
নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ঈদের নামাজ আদায় করবেন ইমামে রাব্বানী দরবার শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দেদী।
ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জস্থ লালকুঠি পাক দরবার শরীফে অনুষ্ঠিতব্য ঈদের জামাতে অংশ নিবেন বর্তমান গদিনশীন পীর খাজা মোহাম্মদ সুজাউদ দৌলা।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া মির্জাখীল দরবার শরীফে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবেন শাহ সুফি গোলাম রেজা জাহাঙ্গীর।
মীরসরাই দরবার শরীফের ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করবেন শাহ ছুফি আল্লামা আবদুল মোমেন নাছেরী।
দেশের বিভিন্ন দরবার শরীফে ঈদের এই আয়োজনগুলো শুধু নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নামাজ শেষে ভক্তদের সঙ্গে কোলাকুলি, শুভেচ্ছা বিনিময়, মতবিনিময়ের মাধ্যমে দরবার প্রাঙ্গণে ভাতৃত্বের মেলবন্ধন তৈরী হয়। বিভিন্ন দরবারের পীর সাহেবগণ ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন ভক্ত-মুরিদান ও মুসল্লীদের সাথে। এতে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির পাশাপাশি আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও চেতনার প্রসার ঘটে।