কার্ণাটকে খাজা বন্দে নেওয়াজ গেসু দারাজের নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

 

ইন্ডিয়ার দাক্ষিণাত্য অঞ্চলের আধ্যাত্মিক জগতের প্রতিভূ এবং চিশতিয়া তরীকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক হযরত খাজা বন্দে নেওয়াজ গেসু দরাজ (রহ.) কেবল একজন আধ্যাত্মিক সাধক‌ই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একাধারে প্রথিতযশা পণ্ডিত, সমাজ সংস্কারক এবং সমকালীন ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ১৩২১ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে জন্মগ্রহণকারী এই মহান সাধকের প্রকৃত নাম সৈয়দ মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আল-হুসাইনি। ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি দাক্ষিণাত্যের কালবুরগিতে (বর্তমান কর্ণাটক) পাড়ি জমান এবং সেখানে তাঁর উদারতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জীবনদর্শনের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেন। তাঁর এই মহান উত্তরাধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তাঁর বংশধরগণ এবং ভক্তরা ইন্ডিয়ার কর্ণাটক রাজ্যের কালবুরগি শহরে গড়ে তুলেছেন বিশাল এক প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, যা মূলত ‘খাজা এডুকেশন সোসাইটি’ (KES) দ্বারা পরিচালিত হয়।

 

উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়
খাজা সাহেবের আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক উত্তরাধিকারকে আধুনিক যুগে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কালবুরগির রাউজা-ই-বুজুর্গ এলাকায় ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে খাজা বন্দে নেওয়াজ বিশ্ববিদ্যালয় (KBU)। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের পাশাপাশি সুফি স্টাডিজ ও ইসলামিক সংস্কৃতির ওপর উচ্চতর গবেষণার বিশেষ সুযোগ প্রদান করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য হলো আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের এক মেলবন্ধন ঘটানো।

এছাড়া প্রযুক্তিগত শিক্ষার উৎকর্ষ সাধনে ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত খাজা বন্দে নেওয়াজ কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (KBNCE) দক্ষিণ ভারতের এক শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। কালবুরগির সিপিবিএ রোডে অবস্থিত এই কলেজটি থেকে প্রতি বছর শত শত প্রকৌশলী তৈরি হচ্ছে যারা মেকানিক্যাল, সিভিল ও কম্পিউটার সায়েন্সের মতো আধুনিক শাখায় বৈশ্বিক অবদান রাখছেন।

 

চিকিৎসা ও জনকল্যাণমূলক হাসপাতাল
তাসাউফের ‘খিদমতে খালক’ বা সৃষ্টির সেবা দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিতে চিকিৎসা খাতেও এই দরগাহর অবদান অপরিসীম। কালবুরগির শাহবাজার রোডে অবস্থিত খাজা বন্দে নেওয়াজ ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (KBNIMS) দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রধান একটি মেডিকেল কলেজ। এর সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়েছে মেইন রোডে অবস্থিত ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট খাজা বন্দে নেওয়াজ টিচিং হাসপাতাল। এখানে আর্তমানবতার সেবায় আধুনিক চিকিৎসা অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। এছাড়া দক্ষ নার্স ও প্যারামেডিক তৈরির জন্য রাউজা-ই-বুজুর্গ ক্যাম্পাসে রয়েছে বিশেষায়িত নার্সিং কলেজ। এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো আজ কেবল কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়, বরং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পুরো দাক্ষিণাত্য অঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্যসেবার ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

 

স্কুল ও প্রাথমিক শিক্ষা নেটওয়ার্ক
তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত আধুনিক ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে সোসাইটির অধীনে বেশ কিছু স্কুল ও কলেজ অত্যন্ত সুনামের সাথে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে খাজা এডুকেশন সোসাইটি ক্যাম্পাসে অবস্থিত সৈয়দ আকবর হুসাইনি আইসিএসই (ICSE) স্কুলটি কালবুরগির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইংরেজি মাধ্যম স্কুল হিসেবে সুপরিচিত। পাশাপাশি নারী শিক্ষার বিশেষ গুরুত্ব বিবেচনা করে রাউজা-ই-বুজুর্গ এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে বিবানি গার্লস হাই স্কুলপ্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো মুসলিম নারীদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে মূলধারার কর্মক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে খাজা সাহেবের সেই মহান দর্শনই প্রতিফলিত হচ্ছে যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও পার্থিব শিক্ষার মাঝে কোনো কৃত্রিম বিভেদ রাখা হয়নি।

 

ধর্মীয় গবেষণা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান
খাজা সাহেবের মূল আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে দরগাহ শরীফ কমপ্লেক্স আজও শান্তি ও ঐক্যের মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দরগাহ প্রাঙ্গণে অবস্থিত মাদ্রাসা-ই-খাজা বন্দে নেওয়াজ ঐতিহ্যবাহী সুফি ঘরানার তালীম ও তাসাউফের জ্ঞান দান করে আসছে। এখানকার কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে খাজা সাহেবের নিজের হাতে লেখা ৩,০০০-এর বেশি বিরল ফারসি ও আরবি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে, যার মধ্যে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘মিরাজুল আশিকিন’ অন্যতম। দরগাহ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত বিশাল লঙ্গরখানায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য তবারক বা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়, যা বৈষম্যহীন এক ভ্রাতৃত্বের সমাজ ফুটিয়ে তোলে।

 

এই সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক মডেলটি প্রমাণ করে যে, হযরত খাজা বন্দে নেওয়াজ গেসু দরাজ (রহ.)-এর শিক্ষা কেবল তসবিহ পাঠে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল একটি শিক্ষিত, সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়ার এক কালজয়ী আধ্যাত্মিক দর্শন।

আরো পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ পঠিত