মানবজীবন মূলত সময়ের সমষ্টি। সময়কে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারোপযোগী করে মহান আল্লাহ তাআলা দিন, রাত, মাস ও বছরের মতো বিভিন্ন পর্বে বিভক্ত করেছেন। পবিত্র কুরআনে সূরা তাওবার ৩৬ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধানে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই মাসের সংখ্যা বারোটি; এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।” অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, “তিনিই সূর্যকে তেজস্কর এবং চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং তার জন্য বিভিন্ন মঞ্জিল নির্ধারণ করেছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো।”
নতুন চাঁদের আবির্ভাবের মাধ্যমে শুরু হয় নতুন মাস এবং নতুন বছরের পথচলা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন চাঁদ দেখে দোয়া করতেন: “হে আল্লাহ! এ চাঁদকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের বাহন করুন; আমাদেরকে আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন।”
নানান বর্ষগণনার ইতিহাস
মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায় নিজ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেছে। আরবদের মধ্যেও বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সন প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে আমুল ফীল, আমুল ফুজ্জার, আমুল ফাতহ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তারা রোমান সনও ব্যবহার করত। ব্যাবেলীয় সন সম্রাট বুখতে নসরের যুগকে কেন্দ্র করে, খ্রিষ্টাব্দ হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মকে কেন্দ্র করে এবং বিক্রমাব্দ ভারতীয় উপমহাদেশে রাজা বিক্রমাদিত্যের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে প্রচলিত হয়। ইতিহাসের প্রতিটি বর্ষপঞ্জির পেছনে কোনো না কোনো ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা জড়িত রয়েছে।
হিজরি সনের প্রবর্তন
হিজরতের সতেরো বছর পর ইসলামী খেলাফতের বিস্তার ঘটলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে তারিখ নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কুফার গভর্নর হযরত আবু মূসা আল-আশ‘আরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এ বিষয়ে খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের একটি পরামর্শ সভা আহ্বান করেন। সভায় নানান জন নানান প্রস্তাব দেন; বিশেষত হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু প্রস্তাব করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতকে হিজরি সনের সূচনা ধরা হোক। কারণ হিজরতের মাধ্যমেই ইসলামের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভিত্তি সুদৃঢ় হয় এবং মানব ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটে। হযরত উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মহররম মাসকে বছরের প্রথম মাস এবং জিলহজ মাসকে শেষ মাস নির্ধারণের পরামর্শ দেন। সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মতিক্রমে এ প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং তখন থেকেই হিজরি সনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
হিজরতের তাৎপর্য
‘হিজরত’ শব্দের অর্থ ত্যাগ করা, পরিত্যাগ করা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হওয়া। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনের নিরাপত্তার জন্য নিজ আবাসভূমি ত্যাগ করাকে হিজরত বলা হয়। নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় পৌঁছার পর লোকেরা তাঁর উটের লাগাম ধরতে আগ্রহী হলে তিনি বলেন, “উটকে ছেড়ে দাও; সে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী চলবে।”
অবশেষে উটটি বনু নাজ্জার গোত্রের এলাকায় হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ির সামনে বসে পড়ে। সেখানেই নবীজির অস্থায়ী আবাস স্থাপিত হয় এবং পরবর্তীতে সেখানে নির্মিত হয় ঐতিহাসিক মসজিদে নববী।
হিজরি নববর্ষ উদযাপনের প্রয়োজনীয়তা
হিজরি সন কেবল একটি বর্ষপঞ্জি নয়; এটি মুসলিম জাতির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রতীক। দুঃখজনকভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক দেশেই হিজরি নববর্ষ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় না। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও প্রায়শই এ দিবস উপেক্ষিত থেকে যায়। তবে বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে হিজরি নববর্ষ উদযাপনের যে ধারাবাহিক আয়োজন চলছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। বিশ্বশান্তির দূত, মানবতার মুক্তির পথপ্রদর্শক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্মৃতিবিজড়িত এই সনের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে পহেলা মহররম সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজরি নববর্ষ উদযাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
হিজরি সন কেবল একটি সময় গণনার পদ্ধতি নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, আত্মপরিচয় এবং আত্মত্যাগের এক জীবন্ত স্মারক। ইসলামের সূচনালগ্নে সংঘটিত মহান হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রবর্তিত এই বর্ষপঞ্জি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সত্য ও ন্যায়ের পথে সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের অনন্য শিক্ষা। হিজরতের মাধ্যমে যে নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল।
আজকের মুসলিম সমাজ যখন নানা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পরিচয় সংকটের মুখোমুখি, তখন হিজরি সনের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সময়ের অপরিহার্য দাবি। হিজরি নববর্ষ উদযাপন কোনো আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি, ঈমানি চেতনার পুনর্জাগরণ এবং ইসলামী মূল্যবোধে নিজেকে পুনর্গঠনের এক মহৎ উপলক্ষ।
অতএব, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সকল পর্যায়ে হিজরি সনের ব্যবহার বৃদ্ধি, ইসলামী ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংরক্ষণ এবং পহেলা মহররমকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হতে পারবে এবং ইসলামী সভ্যতার গৌরবময় উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের কাছে সার্থকভাবে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।
নতুন হিজরি বছর আমাদের জীবনে বয়ে আনুক ঈমানের দৃঢ়তা, আমলের বিশুদ্ধতা, মানবকল্যাণের প্রেরণা এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের অবিরাম সাধনা।
লেখক: প্রকাশনা সচিব, হিজরি নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম।