খলিফায়ে গাউছে মাইজভাণ্ডার আল্লামা আমিনুল হক ফরহাদাবাদী রহ.

লেখক: শাহজাদা সৈয়দ ফয়জুল আবেদীন আরমান ফরহাদাবাদী

 

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: “নিশ্চয়ই আল্লাহর অলিদের জন্য কোনো ভয় নেই, তাঁরা চিন্তিও হবেন না।” (সুরা ইউনুস, ৬২)

নূরের এক অবিচ্ছিন্ন ধারায় সঞ্জীবিত চট্টগ্রামের ফরহাদাবাদে শায়িত আছেন আল্লাহর এক মহান আউলিয়া ইলমে শরীয়ত ও ইলমে মারিফতের এক উজ্জ্বল প্রদীপ, আওলাদে রাসুল, মুফতিয়ে আযম, গাউছে জামান, মারজাউল মাশায়েখুল আলম, ইমামে আহলে সুন্নাত, মাইজভাণ্ডারী তরিকার সর্বপ্রথম কিতাবের লেখক, হযরত শাহছুফি আল্লামা সৈয়দ আমিনুল হক ফরহাদাবাদী রহ.। তাঁর মুর্শিদ ছিলেন মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক গাউছুল আজম, সোলতানুল আরেফীন হযরত শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী মাইজভাণ্ডারী।

শায়খুল ইসলাম আল্লামা ফরহাদাবাদীর জ্ঞানসাধনার সূত্রপাত হয়েছিল ছাত্র অবস্থায় শহর কুতুব হযরত আমানত শাহ’র এক আধ্যাত্মিক নজরে। পরবর্তীতে পিতা আল্লামা শাহসূফী সৈয়দ আব্দুল করিম’র নিবিড় তত্ত্বাবধানে, যিনি নিজেই ছিলেন ১৭০০ শ্লোক সমৃদ্ধ নাজমে দিলকোশা ফি মিলাদে মোস্তফা’র মতো অনুপম কাব্যগ্রন্থের স্রষ্টা। এই জ্ঞানদীপ্ত পরিমণ্ডলে লালিত হয়ে তিনি ফতোয়া শাস্ত্রে এমন জবরদস্ত দক্ষতা অর্জন করেছিলেন যে, তাঁর প্রজ্ঞার সুঘ্রাণ দেশের সীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছিল। সুদূর মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেমগণ কর্তৃক তাঁর ফতোয়া প্রশংসিত হয়েছিল। যে কারণে তাঁর ‘মুফতিয়ে আযম’ উপাধি কেবল লৌকিক স্বীকৃতিতে নয়, বরং উচ্চতর ইলমের মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রজ্ঞা ছিল তাঁর নিরলস ইলমে তাসাউফ, ইলমে ফিকাহ, মানতিক ও দর্শন চর্চার ফল, যেখানে তিনি শীতের তীব্রতম রজনীতেও আরাম আয়েশ পরিহার করে আধ্যাত্মিকতার চর্চায় নিজেকে সমর্পণ করতেন, যেন এই পার্থিব দেহ তাঁর জ্ঞানান্বেষণের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।

আল্লামা ফরহাদাবাদীর আধ্যাত্মিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো গাউছুল আযম হযরত শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর প্রতি আত্মসমর্পণ। তিনি ইশকের প্লাবন ও‌ ইলমে তাসাউফের সেই চিরন্তন সত্য উন্মোচন করেন, যেখানে যুক্তি ও প্রমাণের পথ শেষ হয় আর শুরু হয় রূহানী ফয়েজের এক আধ্যাত্মিক যাত্রা। তাঁর আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত মূহুর্তটি আসে যখন হযরত গাউছুল আযম মাইজভাণ্ডারী প্রকাশ্যে আল্লামা ফরহাদাবাদী কর্তৃক রচিত তোহফাতুল আখ্ইয়ার ফি দাফ-ই শরারাতিল আশরার শ্রবণান্তে আল্লাহর দরবারে সিজদা সহকারে শুকরিয়া আদায় করেন এবং তাঁকে ঐতিহাসিক খেলাফত প্রদান করেন।

“আমার ছয়টি কিতাব থেকে একটি তোমাকে দিলাম, আমার বারজন ইমামের মধ্যে একজন তোমাকে নিযুক্ত করলাম, বারটি বাতি থেকে একটি তোমার, বারটি কাছারি থেকে একটি তোমার।”— এই ঘোষণার মাধ্যমে আল্লামা ফরহাদাবাদীকে মাইজভাণ্ডারী তরিকার অন্যতম ধারক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যা গাউছুল আযমের আধ্যাত্মিক জ্যোতিকে বহন করার মশাল। এই ঘটনা শরীয়ত ও তরিক্বতের দ্বৈত পথে হাঁটা এক সাধকের পূর্ণাঙ্গ কামালিয়াতের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।

গাউছে জামান আল্লামা ফরহাদাবাদীর প্রজ্ঞার উজ্জ্বলতা সমকালীন জ্ঞানী ও সাধকদের হৃদয়েও এক গভীর রেখাপাত করেছিল। অছিয়ে গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী রচিত সুবিখ্যাত গ্রন্থ বেলায়তে মোতলাকা গাউছে জামান আল্লামা সৈয়দ আমিনুল হক ফরহাদাবাদীর প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিক মর্যাদার এক সমুজ্জ্বল দলিল বহন করে। এই কালজয়ী আকরগ্রন্থে তিনি যেমন আল্লামা ফরহাদাবাদীর ভূয়সী প্রশংসায় করেছেন, ঠিক তেমনই একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাকে উল্লেখ করেছেন: স্বয়ং গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী আল্লামা ফরহাদাবাদীর রচিত গ্রন্থ তোহফাতুল আখ্ইয়ার ফি দাফ-ই শরারাতিল আশরার’র উপর স্বহস্তে দস্তখত করেছিলেন।

প্যালেস্টাইন যুদ্ধের গাজী ও শহীদ হযরত আল্লামা শাহসূফী সৈয়দ আব্দুল হামিদ বোগদাদী পবিত্র কা’বা শরীফের আঙিনায় তাঁকে আরবি জ্ঞানের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে তাঁর লিখনীকে হীরার ধারের সাথে তুলনা করেছিলেন।

ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা গাজী সৈয়দ আজিজুল হক শেরে বাংলা দিওয়ানে আজিজ কিতাবে গাউছে জামান আল্লামা ফরহাদাবাদীকে ছৈয়দুল মুনাজেরীন এবং ফখরুল আরেফিনসহ ১৮টি উচ্চ মর্যাদার লক্ববে ভূষিত করেন, যা তাঁর অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানকে নিশ্চিত করে।

হযরত মাওলানা দোস্ত মোহাম্মদ’র ভাষায়, ইমাম আযম আবু হানিফার পর যদি কোনো ইমাম আযম পৃথিবীতে আসতেন তবে আল্লামা সৈয়দ আমিনুল হক ফরহাদাবাদী অবশ্যই সেই পদে আসীন হতেন। এই মন্তব্যটি তাঁকে ফিক্‌হ শাস্ত্রে অন্যতম সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনের জন্য আহ্বান করে।

আলহাজ্ব ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তার উল্লেখ করেন, ১৯৩৯ সনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পর আমি ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পথে মিশরের কায়রোতে যাত্রাবিরতি করি। কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী কৃষ্টি ও ইতিহাসের অধ্যাপক ড. মমতাজ উদ্দিনের মাধ্যমে আল আজহারের রেক্টরের সাথে দেখা করতে গেলে তিনি আমার জন্মস্থান ভারতবর্ষের চিটাগং (চট্রগ্রাম) শুনে আমাকে বললেন : “You are lucky. You have come from the birth place of Gawsul Azam Hazrat Shah Ahmadullah Maizbhandari.” পরে জানতে পারলাম আমাদের দেশের ন্যায় মিশরে হজরত জুননুন মিশরীর আমল (১৫ শতাব্দী) হতে কিছু বিষয়ে এখতেলাফ – মতবিরোধ রয়েছে এবং এ বিষয়ে তোহফাতুল আখইয়ার (আল্লামা ফরহাদাবাদীর লিখিত) মিশরের আল-আজহারপন্থী প্রগতিশীলদের নিকট খুবই প্রিয় এবং খলিফার সুবাদে হযরত গাউসুল আযম শাহ সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী মিশরে সুপরিচিত।

আল্লামা বজলুল করিম মন্দাকিনী তাঁর প্রশংসায় উল্লেখ করেন:

মাওলানা আমিনুল হক ফরহাদাবাদ বাসী,
উজ্জ্বল করিলেন দেশ পাপের তিমির নাশী।

 

আল্লামা ফরহাদাবাদীর জীবন ছিল শরীয়তের নিগূঢ়তা এবং তরিক্বতের প্রগাঢ় প্রেমের এক কাব্যিক উপাখ্যান। তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার তাঁর একমাত্র পুত্র গাউছে জামান হযরত শাহ সুফি মুফতি আল্লামা সৈয়দ ফয়জুল ইসলাম ফরহাদাবাদীর চতুর্থ পুত্র ফরহাদাবাদ দরবার শরীফের বর্তমান মোতোয়াল্লী ও সাজ্জাদানশীন শাহ সুফি সৈয়দ আজিজুল হক ফরহাদাবাদীর মাধ্যমে আজও প্রবাহিত। আল্লামা ফরহাদাবাদী সেই নূরের প্রদীপ, যা আজও বেলায়েতের পথে পথিকদের জন্য ইশকের মশাল হাতে পথ দেখায়। প্রতি বছর ২৭ অগ্রহায়ণ মোতাবেক ১২ ডিসেম্বর এই আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের পবিত্র ওরশ শরীফ ফরহাদাবাদ দরবার শরীফে আনজুমানে গাউছিয়া আমিনিয়া ফয়জিয়া আজিজিয়া কেন্দ্রীয় পরিষদ ও আল্লামা ফরহাদাবাদী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভক্ত অনুরক্তদের সমাগম হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে তাঁর প্রিয় বান্দার ফয়েজ ও বরকত দান করুন, আমীন।

সর্বশেষ

গত ১২ ডিসেম্বর, রোজ শুক্রবার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম শাহানশাহ্ হযরত…

মাইজভাণ্ডারী যুব ফোরামের উদ্যোগে গতকাল ১১ ডিসেম্বর রোজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নানুপুর লায়লা-কবির ডিগ্রী কলেজে…

লেখক: শাহজাদা সৈয়দ ফয়জুল আবেদীন আরমান ফরহাদাবাদী   পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: “নিশ্চয়ই আল্লাহর অলিদের…

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মশুরীখোলা দরবার শরীফের বর্তমান গদিনশীন পীর শাহ মুহাম্মদ সাইফুজ্জামান সাহেবের দায়িত্ব গ্রহণের ১ম…

আজ ১০ ডিসেম্বর, রোজ বুধবার চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসার বার্ষিক…

আওলদে রাসুল (দ.), আওলাদে গাউছুলআজম মাইজভাণ্ডারী (ক.), প্রথিতযশা চিকিৎসক, সমাজসংস্কারক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মাইজভাণ্ডারী তরিকার…

মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর অন্যতম প্রধান খলিফা সৈয়দ আমিনুল হক ফরহাদাবাদীর…

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের গাউছিয়া রহমান মঞ্জিলের মাইজভাণ্ডারী যুব ফোরাম’র উদ্যোগে আগামী ১১ ডিসেম্বর,…

আজ ৭ ডিসেম্বর, কুমিল্লা শহরে অবস্থিত বখশীয়া দরবার শরীফ’র বখশীয়া যুব ফোরাম’র ৭ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী।…

গত ৫ ডিসেম্বর, রোজ শনিবার চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার রাজাপুরা দরবার শরীফে ৩৪তম বাৎসরিক ওয়াজ মাহফিল…

বাংলাদেশের সুফি সংস্কৃতি চর্চার সংগঠন শাহেন শাহে সিরিকোট ইসলামী সাংস্কৃতিক ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ, চট্টগ্রাম’র…

আজ ৪ ডিসেম্বর, রোজ বৃহস্পতিবার আযহার একাডেমী – বাংলাদেশ’র পক্ষ থেকে ৫জন আযহারী স্কলারের তত্ত্বাবধানে…